মফস্বল হতে রাজধানী শহর ঢাকাতে রুটী রুজীর মেহনতে আসা এক সাধারন আদমী আমি। আর দশজন সাধারন ছাত্রের মতোই সরকারী ইউনিভার্সিটির মাগনা হল, প্রায় বিনা পয়সার খাবার, নামমাত্র ফিস-এসব কিছুর বদৌলতে দুই দুইটা ভারি ডিগ্রী-স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে কী করে কী করে যেন একটা চাকরীও জুটিয়ে ফেলি। এরপর নানান প্রক্রিয়ায় এই চাকরী সেই চাকরী, ইতরামী, চোতরামী, নাদানি-নানা কায়দা করে ঢাকা শহরের এক বিশিষ্ট কেরানী আজকের এই আমি-সেদিনের সেই মফস্বল আদমী।
সহকর্মীদের সাথে, হাতে গোনা দু’একজন সাবেক বন্ধু’র সাথে জীবনের সফলতা, ব্যর্থতা, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত, সোসাল স্ট্যাটাস-এসব নিয়ে কথা হয়। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে সেই স্কুল হতে আজকের ঢাকাইয়া কেরানীর জীবন-পুরোটার একটা টালি করতে বসলাম। সফলতা আর ব্যর্থতার খাতাটা ঝালাই করলাম। এই একটা লম্বা সময়ে যতজনের সাথে পড়েছি, যতজনের সাথে আলাপ-তাদের জাগতিক প্রাপ্তি, বাহ্যিক চাকচিক্য, স্ট্যাটাসের চিকনাই-কখনো কখনো ক্ষনিকের জন্য হলেও চিন্তাকে থমকে দাড়িয়ে ভাবতে বাধ্য করে-জীবনে কি সফল হলাম নাকি ব্যর্থ?
আমার প্রয়াত বাবাজান খুব উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। আম্মাজানও ডিগ্রিধারী নন। আমার বাবাজান সামান্য সরকারী কর্মচারী ছিলেন। সারাদিন কাজ শেষে রাতে ফিরতেন। এত খাটাখাটুনি করেও রাতে আমাকে নিজের কাছে ডেকে নিতেন। সবাই যখন বিটিভিতে প্রোগ্রাম দেখত তখন তিনি আমাকে বাল্যশিক্ষা আর আদর্শলিপি হতে শ্লোক আর নীতিশাস্ত্র মুখস্ত করাতেন। বাবাজান আর মাকে প্রায়ই “এটা নেই, ওটা নেই, ওদের আছে আমাদের নেই” অনুযোগ করতাম। আমার স্বল্পশিক্ষিত বাবাজান-আম্মাজান আমাদের বলতেন, পড়, পড়। ”মানুষ” হও। আমাদের তারা মানুষ করার চেষ্টা করতেন। কে যেন একবার স্কুল বা ইউনিভার্সিটিতে বলেছিলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষ হওয়া, ডিগ্রিধারী না।” অনেকেই বলতেন, এগুলা অক্ষমের সান্তনা। যারা কিছু করতে পারে না তাদের নিজেকে নিজে বুঝ দেবার ধান্দা।
যদিও আমি বিশ্বাস করি সফলতা/ব্যর্থতা, সুখ/অসুখ, স্ট্যাটাস-এ সবকিছুই একটা আপেক্ষিকতার নাম। তবে হুরপরীর রাজ্যে বিচরন করতে গেলে স্বয়ং যুধিষ্ঠিরও হয়তো একটু ইর্ষান্বিত হতেন। চতুর্পার্শ্বের অসংখ্য সফল (!) পুরুষ, সফল নারীর নিত্যনতুন স্ট্যাটাস, প্রতিনিয়ত ফুলে ফেঁপে ওঠা সোস্যাল ক্লাস, বাড়বাড়ন্ত ক্যারিয়ার, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, চেকইন-এতসব চাকচিক্য স্বয়ং সংসারবিরাগী বুদ্ধেরও মাথা ঘুরিয়ে দিত বলে আমার বিশ্বাস। আমিতো কোন ছার। আর এখনকার দিনে সোসাল মিডিয়া হতে পালিয়ে যাবার যেহেতু কোনো সুযোগ নেই, তাই প্রতিনিয়ত প্রচুর সফল ব্যক্তিত্বের নানা সফলতার রঙিন ঘুড়ির অবাধ প্রদর্শন চাই বা না চাই দেখতে হয় এবং নিজেকে কিঞ্চিত ক্লিষ্ট করতে হয়। সফল হবার মন্ত্রটা এত এক্সক্লুসিভ কেন সেটা কিছুতেই মাথায় আসে না।
ছোটবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের শেখানো হত-লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। জানিনা সেই যুগে এই কথার সত্যতা ঠিক ছিল কিনা তবে এই যুগে এই কথা বললে আমার মাথা ভেঙে ফেলবে পাবলিক। কারন এখন গাড়িঘোড়ায় চড়তে গেলে লেখাপড়া কোনো বিষয়ই না। সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আরেকটা দারুন জোকস নজরে পড়ে। কে প্রথম এটা বলেছিল জানি না তবে ওনাকে আমার শত কোটি প্রনাম। বাক্যটা হল কমবেশি এরকম: যারা ফার্স্টক্লাস পায় তারা সরকারী চাকরী নেয় আর কেরানীতে পরিনত হয়ে নিয়ন্ত্রিত বা পোষ মানা হয়। যারা সেকেন্ড ক্লাস পায় তারা পড়া শেষে ব্যবসায় নামে আর ফার্স্টক্লাস পাওয়া আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করে। যারা থার্ড ক্লাস পায় তারা রাজনীতিতে নামে আর প্রথম দুঈদলকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর যারা কোনো ক্লাসই না মানে ফেলটুস, তারা পড়া ছেড়ে মাস্তানী/মাফিয়াবাজিতে নামে আর ফার্স্ট টু লাষ্ট ক্লাস-সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই যখন অবস্থা, তখন ছেলেবেলার মীথ আর আজকের বাস্তবতার মধ্য একটা প্রবল দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন ক্লাসে ফার্স্ট হওয়াটা একটা বিরাট বিষয় ছিল। আমাদের মন মগজে পাখি পড়ার মতো ঢুকিয়ে দেয়া হত-ফার্স্ট হতেই হবে, স্টার পেতেই হবে, বোর্ড স্ট্যান্ড না করলে সে কোনো ছাত্রই না। আমরাও বুঝি না বুঝি, সম্ভব বা অসম্ভব যাই হোক-যেকোনো মূল্যে ক্লাসে ফার্স্ট হবার পেছনে জানপড়ান লাগিয়ে দিতাম। আমার এখনো মনে পড়ে-নোট, গাইড বা একটা সাজেশান পেপার সহপাঠিদের হতে লুকিয়ে রাখার কি প্রানান্তকর হাস্যকর চেষ্টা করতাম সেই সময়। এমনকি আমি এই হাস্যকর কাজটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েও সেখানে দেখেছি। বন্ধুতে বন্ধুতে এনিয়ে মন কষাকষি হত আকছার।
একটা ভাল রেফারেন্স বই বা জার্নাল কিংবা কোয়ালিটি রাইট আপ পেলে সেটা সযত্নে লুকিয়ে রাখত ভাল ছাত্ররা। পাছে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বিরা সেটা পেয়ে তাকে ছাড়িয়ে যায়। কারনটা সেই আদীম চিন্তা-ক্লাসে ফার্স্ট হতেই হবে। ফার্স্ট না হতে পারলে ভবিষ্যত ধু ধু মরুভুমি। তো চেষ্টার ত্রুটি আমরা কেউ করিনি ক্লাসে ফার্স্ট হতে। সবোচ্চ ভাল রেজাল্ট করতে, সবাইকে চমকে দেয়া পজিশন নিশ্চিত করতে। আবার এর মাঝেই কেউ কেউ ছিল স্বেচ্ছা বৈরাগী। ওদের দেখে মনে হত শুধু ভাল রেজাল্ট করা ব্যতিত আর সব কাজেই ওদের অসীম আগ্রহ। গার্লস স্কুলের সামনে দাড়ানো হতে মাঝে মধ্যে একটু আধটু বিড়ির টান-সবই চলত। আমরা ওদের বলতাম দুষ্টু ছেলে। বাবা-মায়েরা ওদের সঙ্গ হতে দুরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। ওদের সাথে মিশলে জীবন ঝড়ঝড়া।
তবে রুঢ় বাস্তবতা হল, সেইসব দুষ্টু ছেলেদের একটা বড় অংশকেই দেখেছি পরের জীবনে উপরে উঠে আসতে। সমাজের কাঙ্খিত যত স্ট্যাটাস, নর্মস, স্বীকৃতি-তার প্রায় সবটাতেই রেকর্ড মার্কস পেয়ে পাশ করতে। আমার মনে পড়ে, আমার কলোনীতে আমার সহপাঠি ও প্রতিযোগী একটা ছেলে থাকত (নামটা বলতে চাই না)। কোনো এক পরীক্ষায় ও আমার চেয়ে ভাল করে। মা আমাকে অপমানের চুড়ান্ত করে বললেন-”ওই ছেলেটার পা ধোয়া পানি খেতে পারিস না?” তবে ভুল বুঝবেন না। আমি তখনকার (কিংবা এখনকার) বাবা-মায়েদের নিন্দা করতে বসিনি। আমি সবকিছুকে আপেক্ষিক ও সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পছন্দ করি। তারা সেটাই করেছেন যেটা তখনকার সার্বিক প্রেক্ষাপটে সমাজের রীতি ছিল। আমাদের বাবা-মায়েরাতো আর আইনস্টাইন বা নিউটনের বাবা-মা হতে পারতেন না। সেই ছাত্র বয়সে মনে হত ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারাটাই সফলতার নিদর্শন। সেকেন্ড হওয়াটাই ব্যর্থতা।
ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিন হতে সবার চেষ্টা থাকে সবচেয়ে সুন্দরী ব্যাচমেটকে জিএফ হিসেবে দখল নেয়া। যে যতটা চোস্ত ততটাই তার জিএফ ভাগ্য। তখন মনে হত, জিএফ বাগাতে যে যতটা কার্যকর সে ততটাই সফল। যাদের জিএফ নেই, থাকলেও তেমন মার্কা নেই, তারা ব্যর্থ। ফার্স্ট, সেকেন্ড হবার চুড়ান্ত ঐকান্তিকতার গলি/চোরাগলি পাড় হয়ে ইউনিভার্সিটি শেষ করলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে একটা চাকরীও বাগিয়ে নিলাম। মনে হল সফল হলাম। আমাদের সহপাঠিরাও যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। কেউ চাকরী, কেউ ব্যবসা, কেউ ধান্দা, কেউ রাজনীতি, কেউ শশুরের আদরের মনি! যারা ”বিসিএস ক্যাডার” হল তারা ভাবল চাঁদ হাতে পাওয়া গেল। যারা পেল না, তারা ভাগ্যকে মেনে নিল আর ঢুকল নানান প্রাইভেট জবে-উচ্চ মাহিনায়। ভাবল, যাক বেতনে পুষিয়ে যাবে-আমিও সফল। ওদিকে বিসিএস ক্যাডারের মন খারাপ-সিল-সিগনেচার ছাড়া আর কী পেলাম জীবনে।
হালে এসে আবার সরকার বাবাজি দিল সরকারী কামলাদের মজুরী আকাশ ছোঁয়া করে। বিসিএসদের পোয়া বারো আর প্রাইভেটারদের মাথায় হাত। কালে কালে বহু বছর পার হল। মধ্যবয়সে এসে পড়ল জীবন। মাঝে মধ্যে ন্যাংটো কালের জীবন হতে এই মধ্য বয়সের জীবনের ট্যালি করতে বসি। জীবন সফল নাকি বিফল? একটা খুব আশ্চর্য বিষয় কী জানেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এযাবৎ শিখে আসা মীথের কোনো তালগোল পাই না।
ওইযে বলেছিলাম না, “যারা কোনো ক্লাসই না মানে ফেলটুস, তারা পড়া ছেড়ে মাস্তানী/মাফিয়াবাজিতে নামে আর ফার্স্ট টু লাষ্ট ক্লাস-সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে”-জগতে এর ভুড়ি ভুড়ি উদাহরন। বাস্তব অভিজ্ঞতায় যতটা দেখেছি, মধ্যম বা পরের সারিতে যারা ছিল একাডেমিতে, তুলনামুলক তারাই এখন এগিয়ে আছে সোস্যাল স্ট্যাটাসে কিংবা আপেক্ষিক স্ট্যাটাসে।
তথাকথিত ভাল ছাত্ররা মোটামুটি কেরানী কিংবা কর্পোরেট দাস হয়ে একটা টাইপড নাগরিক জীবন ধুঁকে ধুঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের মিডিয়াম বা থার্ড ক্লাস সহপাঠিরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্ট্যাটাসের ছক্কা মারছে। নিত্যনতুন গাড়ি, বারিধারার ফ্ল্যাট, পূর্বাচলের প্লট, সুইস ব্যাংকে ব্যালেন্স, সেলফী কুইন শশুর-কন্যা (মানে বউ), কিউটের ডিব্বা দু”খানা মানব ছানা, চেকইন, ট্রাভেল, ট্যুর, সোস্যাল মিডিয়া, স্ট্যাটাস আপডেট, ক্রীকেট মাঠের দর্শক, তৃপ্ত আয়েশি সামাজিক সুখের ঢেকুর-অনেকটাই দিয়েছে জীবন তাদের। এখন মনে হয়, ওরাই সফল।
সফলতার মিটার বয়সে বয়সে বারবার বদলেছে। কখনো সেটার নিয়ামক ছিল ভাল রেজাল্ট, কখনো ভাল জিএফ, কখনো বা বিসিএস, কখনো প্লট, কখনো ফ্ল্যাট, কখনো আবার অন্যকিছু। সফল হলাম কি ব্যর্থ হলাম সেটার বিচার করে শেষ করতে পারি না। ঠিক করেছি না বেঠিক, ঠিক রাস্তায় হেঁটেছি নাকি ভুল, ভবিষ্যত আলোকিত নাকি ঝরঝরা-সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। একটা বিষয় আমার ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস হয়-আমাদের প্রত্যেককে শিক্ষাজীবনের শুরু হতে একটা ভুল মীথ নিয়ে বড় করা হয়। সফল হবার মীথ। প্রতিযোগীতায় ফার্স্ট হবার মীথ। পয়েন্ট অর্জনের মীথ। মা-বাবা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, পাড়াপ্রতিবেশি-সবাই অষ্টপ্রহর কানের কাছে চিৎকার করে বলত-ফার্স্ট হও, সফল হও। যেখানেই কান পাতবেন, কেবল ফিসফিস।
কয়টা ফ্ল্যাট হল, অথবা, কতজনের সাথে ফ্ল্যার্ট করা হয়-তার ফিসফিস।
কয়টা প্লট হল, অথবা, কতজনের পেছনে প্লট করে ফাঁসানো হবে-তার ফিসফিস।
সমাজে কতটা পজিশন হল, কতটা এখনো বাকি-তার ফিসফিস।
কাকে কীভাবে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো গিয়েছে, কার কতটা শেষ হয়ে গিয়েছে-তা নিয়ে উল্লাসের ফিসফিস।
কাল কোথায় বেড়ালাম, পরশু কোথায় বেড়াবো, কয়টা একাউন্ট হল, কোন একাউন্টে ডলার উপচে পড়ছে, কয়টা ডিল বাগাতে দেরী হচ্ছে, কত রমনীর মনের জগতে হামলা করা গেল-তার ফিসফিস।
শুধু অর্জন আর বর্জনের ফিসফিস।
কিন্তু আমাদের কেউ স্বার্থক হতে শিখাতো না। জীবনকে অর্থবহ হবার উপদেশ কেউ দিত না। মানুষের মতো মানুষ হও-এই দোয়া অবশ্য মাঝে মধ্যে মুরব্বীদের কদমবুসী করতে গেলে শুনতে হত তবে সেই ”মানুষের মতো মানুষ”টা যে ঠিক কী-সেটা কেউ শেখাতো না। তার অবশ্যম্ভাবি পরিণতিতে জীবনের সব শিক্ষা-অশিক্ষায়, লক্ষ্য ও অলক্ষ্য সবকিছুতে তালগোল পাকিয়ে আজ আমরা এক অদ্ভুৎ জীবনবোধের সামনে দাড়িয়ে।
আমার একজন প্রাইমারীর সহপাঠির সাথে দীর্ঘ ২০ বছর পর একবার হঠাৎ দেখা হয়েছিল। নিজ এলাকাতে ও পান, সুপারী বিক্রি করে সংসার চালায়।
আমার প্রাণের সহপাঠির অবস্থা দেখে খুশি হব নাকি পীড়িত হব-সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই দেখি বন্ধু আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই নিজেই হেসে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে “বিদ্যুৎ না?” (আমার নিক নেম)। কথা হল অনেকক্ষণ ওর সাথে। জীবন নিয়ে তার কত আনন্দ স্মৃতি, কত প্রাপ্তির সুখ। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবাকে নিয়ে তার দারুন মফস্বলের সংসার। বিন্দুমাত্র ক্ষেদ নেই জীবন নিয়ে। অথচ বিপরীতে শহুরে কর্পোরেট আমাদের নিত্য কত হতাশা? পজিশনটা আরেকটু বড় কেন হল না? উত্তরার ফ্ল্যাটটা না হয়ে বনানীরটা কেন পেলাম না? ট্যাক্স কাটার পর এত সামান্য ব্যালেন্স কেন ব্যাংকে? ছেলেটাকে ইংলিশ মিডিয়ামে দিতে পারি নি। পারলেও আবার একদম টপ স্কুলটাতে দিতে পারিনি-আফসোস। ইত্যাদি কত কী?
আমার পান বিক্রেতা বন্ধু তার কাজ ও সময় নিয়ে অত্যন্ত সুখী এবং তার মনের মতো সফল। সোস্যাল স্ট্যাটাসের ঘাটতি, তার বন্ধুদের সামাজিক উচ্চপদ-কোনোকিছুই তার সফলতার ঢেকুর তোলায় বাধা হয়নি। ছোটবেলার স্কুল ফ্রেন্ড, কলেজ মেট, ইউনিভার্সিটি ব্যাচমেট, হলমেট-সবাই নিজের নিজের মতো করে সমাজে জায়গা করে নিয়েছে। কেউ ক্যাডার, কেউ আর্মস ক্যাডার, কেউ ব্যবসা, কেউ তামাশা।
আমার মেটদের অধিকাংশই ইর্ষা করার মতো সামাজিক পজিশনে চলে গেছে। কি ধনে কি মানে! সবকিছুতেই। আর অধিকাংশই মফস্বল হতে এই যাদুর শহরে এসে একলা একার চেষ্টায়। আর তার পাশেই আছি আমরা-একদা সফল অধুনা নিষ্ফল (বা মাকাল ফল)। কায়ক্লেশে জীবন চালাই, পরের মানিব্যাগ মোটা করতে দিনরাত মুখে রক্ত তুলে খাটি, সামান্য প্রশংসা করলে বিগলিত হই। শেষ বয়সে ধুকে ধুকে ছেলেমেয়ের ভরসায় চলতে প্রস্তুত হচ্ছি।
সফলতার পাঠ গেলাতে গিয়ে আমাদের বড় করা হয়েছে চাকরী করার মধ্য দিয়ে কেরানী হয়ে পরনির্ভর একটা জীবন চালিয়ে নেবার মতো সফল হবার মন্ত্রে। স্বনির্ভর একজন কর্মী, একজন জীবনযোদ্ধা হবার শিক্ষা আমাদের স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি কোনোকালে দেয়নি। সর্বত্রই একটা মন্ত্র মাথায় ঢোকানো হয়েছে-যোগ্য চাকরীজীবি হবার মন্ত্র। হয়েওছি তাই। আর যারা তখন দুষ্টু ছেলে হয়ে ওই মন্ত্রে মন দেয়নি তারাই বরং আজকে তুলনামুলক সফল এবং স্বনির্ভর। সফলতা আর ব্যর্থতা খুব আপেক্ষিক একটি বিষয় বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আমার কাছে যা সফল সেটা অন্যের কাছে ব্যর্থতার নিয়ামক। আজ যে সফল কাল তার সেই অর্জনই ব্যর্থতা মনে হতে পারে। এক বয়সে যেটা উচিত আরেক বয়সে সেটাই অনুচিত মনে হতে পারে।
সাধারনত, মানুষের অভ্যাস হল, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত কিছু ঘটতে দেখলে সে সেটাকেই স্বাভাবিক ও নিয়ম ধরে নেবে। যেমন, ধরুন, প্রতিদিন সূর্যটাকে সে পূর্বদিকে প্রথম দর্শন করে, সে ধরে নিয়েছে, সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়। সত্য হল, সূর্য উদিতও হয় না, অস্তও যায় না।
মানুষের আরেকটা অভ্যাস হল, সে যেটাকে আরাধ্য ও চুড়ান্ত লক্ষ্য বলে মনে করে, সেটা অর্জিত হয়ে গেলে ওই পুরো প্রজেক্টটা নিয়ে তার আর আগ্রহ থাকে না। সে মুহূর্তের মধ্যে অন্য কিছুতে মনোযোগী হয়ে পড়ে আর মুহূর্ত আগেও যেটা তার সর্বাধিক মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল, সেটাকে বিলকুল ভুলে যায়। তড়িঘড়ি সেটা হতে বের হতে চায়।
কিছু মনে না করলে একটা ’অড’ ও ‘লাইভ’ উদাহরন দিই।
(#সবাই১না) গড়পড়তা মানুষ ইরেকশন বা ইজ্যাকুলেশনকেই **সেকস লাইফের সবচেয়ে আরাধ্য, চুড়ান্ত ফলাফল বা অ্যাটিভমেন্ট ধরে নিয়ে, ইরেকশনটা হয়ে যাওয়া মাত্রই নেতিয়ে যায়, তার আর এইসব দিকে, পুরো ঘটনা ও ঘটনাস্থলের দিকে আগ্রহ থাকে না। সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্য দিকে।
সেভাবেই, প্রফেশন ও ক্যারিয়ারে আমাদের আদর্শগতভাবে, পিওরলি থিংক করলে, আমাদের আরাধ্য উদ্দেশ্য বা ইনার অবজেকটিভ কী হবার কথা-তা নিয়ে আমরা একটা ঘোলায় থাকি। আমাদের কাছে জাগতিক লক্ষ্য, টারগেট, চাকচিক্য, কমফোর্ট, প্রপার্টি, ওয়েলথ, পাওয়ার, পজিশন-এগুলোকে মনে হয় আলটিমেট ও আইডিয়াল এক্সপেকটেড গেইন। ফলে, এগুলো পেয়ে গেলেই আমরা কনটেনটেড হয়ে পড়ি। মনে করি, সব পাওয়া হয়ে গেল।
একটা গাড়ি কিনতে পারলেই সেটা নেটিজেনদের দেখানো হলেই মনে করি, জীবনের পাওয়া পূর্ণ হয়ে গেল। আর কী।
ফ্ল্যাটটা বুক করা হলেই মনে করি, জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার হিসেব তো তুকে গেল। আর কী?
জাগতিক ও বস্তুগত এই অর্জনগুলো আপনার আমার জীবনের খুবই গুরুত্ববহ টারগেট ও অর্জন অবশ্যই। তবে আলটিমেট কখনোই নয়, ইনার অবজেকটিভ তো নয়ই। মানুষ হয়ে জন্ম নেবার, প্রফেশনে আসার, ক্যারিয়ারে বিরাজ করবার আলটিমেট গোল ও ইনার অবজেকটিভ একটা গাড়ি, ২৫০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, দেড় লাখ ফলোয়ার কখনোই নয়। তাই, ওটা অর্জিত হলে আনন্দ করুন, নিজেকে সুখী ভাবুন, কিন্তু, নিজেকে পূর্ণ ও সম্পূর্ণ ভাবলে সর্বনাশ করবেন। ইরেকশন যেমন সেকস লাইফের খুব ছোট অথচ ওজনদার ঘটনা, তার পরেও আপনার ওই যাত্রাটায় করার ও এনজয় করার অনেক কিছু থাকে, তেমনি ক্যারিয়ারেও আপনার করবার মতো, অর্জন করবার মতো আরও বহু কিছু থাকে।
সুখী থাকুন, তবে সিলমোহর এঁটে দেয়া সুখী না।
কিপ থার্স্টি। কিপ হাংগ্রি। কিপ আনকনটেনটেড।
আমি বিশ্বাস করি, সফলতা নয়-স্বার্থকতার পিছনে জীবন ঘোড়া ছোটানোটাই হয়তো কাজের কাজ হবে। যা আমি হতে চেয়েছি তা না হতে পারলে আমি ব্যর্থ-এই ভুল বিশ্বাস অনেকেরই আছে। যা হওয়া উচিৎ ছিল-সেটা হতে পেরেছি কিনা সেটাই দেখার বিষয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে করানো টিউশনের কালে, এমনকি সারাজীবনের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় দেখা-
সবচেয়ে Dull ও শেখার ক্ষেত্রে ধীর যে ছাত্রটি, সম্প্রতি জানতে পেরে খুব ভাল লাগল, যে, সে আজ একটি নামি প্রতিষ্ঠানে বেশ ভাল চাকরি করে।
সত্যিকার অর্থেই ছেলেটির ছিল ভয়ানক রকম পশ্চাৎপদতা। এত দুর্বল ছাত্র, যে, আমি নিজেও খুব একটা ভরসা পেতাম না। তার পিতা-মাতা ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন এবং sensible। কিন্তু কোনো এক যাদুবলে সেই ছাত্রটিই সেই deficiency কীভাবে যেন জয় করে ফেলেছে। বুদ্ধিমত্তাও যথেষ্ট আশাপ্রদ।
শৈশবের ভাল ছাত্র-খারাপ ছাত্র নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হলাম ছেলেটির সার্বিক অগ্রগতি দেখে। আমার শৈশবে দেখা অনেক ব্যাকবেঞ্চারই আজকে ইর্ষাযোগ্য পজিশনে আছে।
এবার একটু বিপরীত চিত্রটিও দেখাই।
মনে পড়ে, একবার এক ভদ্রলোক চাকরির জন্য আবেদন করেছেন কিন্তু প্রদত্ত নিয়মাবলির কোনোরকম তোয়াক্কা না করে। স্বাভাবিকভাবেই তার আবেদন প্রাথমিকেই বাতিল হয়েছে। সেটা জেনে ভদ্রলোক আমাকে মেইল করেছেন, যার ভাষ্য অনেকটা,
”ফুহ, আপনাদের এই দুই টাকার চাকরি! সেখানে আবার এত এত ঘাঁইকিচিং, নিয়ম, নীতি! ফুহ! আপনি জানেন, আমি গেল সপ্তায় সরকারী চাকরিতে ঢুকেছি?”
ওয়েল, প্রথমেই তো বললাম,
আমার দেখা ওই ছেলেটি তার ভয়ানক রকম dull brain কী করে যে জয় করে আজকে আর দশজনের একজন হয়েছে-সেটা একটা ম্যাজিক।
তবে, আজ যে বিপরীত চিত্রটি দেখাতে/বলতে এত কথা, সেটা হল-
Result is not an essential, eternal & universal indication of the appropriateness of your path or method.
The process is more important than the results. And if you take care of the process, you will get the results.
Also, majority, popularity, mass acceptability never guarantees the appropriateness or authenticity of anything.
Think twice, think reverse, think vice versa, think different.
Always try a 3rd dimension.
যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে শুনুন।
এক ভদ্রলোকের লেয়ার পোলট্রির খামার ছিল। মাঝে উৎপাদন কমে যাওয়ায় একদিন খামারে গিয়ে হুমকী দিলেন,
”কাল হতে প্রত্যেক মুরগীকে রোজ ২টা করে ডিম পাড়তে হবে। না পারলে দা’য়ের নিচে যেতে হবে।”
১৫ টা মুরগী।
পরের দিন গিয়ে দেখে, খামারে ৩১টা ডিম। বাড়তি ১টা কোথা হতে এলো?
খোঁজ খোঁজ খোঁজ।
মাঝখান হতে মোরগ বলে উঠল,
”বস, দা’য়ের নিচে যাবার ভয়ে আমিও একটা পেড়ে ফেলেছি।”.
আপনার আপাত সাফল্য সবসময় অতি-আবশ্যিকভাবে আপনার পথ ও পন্থার শুদ্ধতার/নির্ভূলতার সূচক নাও হতে পারে। মোদ্দা কথা হল-
অন্যের কথা, কাজ, অর্জন, বিশ্বাস, বোধ, লক্ষ্যকে আপনার লক্ষ্য, বিশ্বাস ও trademark বানালে আপনি কখনো নিজেকে সফল ভাবতে পারবেন না।
তাই,
অন্যের জামায় নিজেকে fit করতে যাবেন না।
অন্যের কাজলে নিজের চোখ রঞ্জিত করবেন না।
অন্যের চশমায় নিজেকে দেখবেন না।
একইভাবে,
নিজের চশমায় অন্যকে বিচার করবেন না।
নিজের চোখের সুরমায় অন্যের চোখকে রাঙাতে চাইবেন না।
নিজের রুচি, পছন্দ, বোধ, বিশ্বাস, দৃষ্টি, কাজ দিয়ে অন্যকে মাপতে যাবেন না।
তুমি আসলে কে,
তুমি আসলে কী,
তুমি আসলে কেমন-সেটা কাউকে বোঝাতে চেয়ে সময় ও এফোর্ট নষ্ট করো না।
অন্যের চোখে তোমাকে কেমন লাগে,
তোমাকে কী মনে হয়-সেটা খুব ম্যাটার করে না।
তোমাকে কেমন লাগছে,
তোমাকে কেমন লাগবে,
তোমাকে কেমন দেখাবে,
তোমার জন্য কেমন হবে-এই সংকোচ নিয়ে নিজের রুচী, পছন্দ ও ভালোলাগাকে কোরবানী করো না।
কে কী বলল,
কে কী ভাবল,
কে কী ভাববে,
কে কীভাবে নেবে,
কে কীভাবে মাইন্ড খাবে-সেই চিন্তা করে নিজের ঘুম খুইয়ো না।
কে কী ভাবল,
কে কী বলল,
কে কী করল আর কার কী করার কথা-তার চিন্তায় নিজের মুড, ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত হতে দিও না।
অন্যের চোখে নিজেকে বসিও না। অন্যের চোখে নিজেকে দেখো না।
অন্যের হাতে নিজের জীবনকে চালিত হবার সুযোগ দিও না।
Your life is yours.
Live it-
Like yours.
For yours.
Of yours.
By yours.
একটা মজার জোক পড়েছিলাম।
আমরা সারাজীবন ভাবি, লোকে কী বলবে। আরেহ, তুমি মরলে লোকে বলবে, “শুক্তটা বেড়ে হয়েছে দাদা, আরেক হাতা দিন। মাছের মুড়ো আছে কিনা দেখুন তো?”
কয়েকদিন আগে একজন ইন্ডিয়ানের এটি পোস্ট আজকে খুব মাথায় গেঁথে গেল। খুব ছোট ও সংক্ষিপ্ত পোস্ট “National Award is simply a joke.” এরপরই তিনি অভিনেতা শাহরুখের স্বদেশ মূভির একটি ছোট ক্লিপ জুড়ে দিয়েছেন (শাহরুখ যেখানে ট্রেনের কামরায় বসে একটি ছোট শিশুর হাত হতে এক কাপ পানি কিনে খান।)
ইঙ্গিতটা খুব পরিষ্কার, শাহরুখের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডটা প্রাপ্য হয়েছিল সেই ১৪ বছর আগে, স্বদেশ মুক্তির পর, অথচ, তাকে জওয়ানের জন্য ২০২৫ এ ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে। এবং, এই ইঙ্গিতটা আমার অনেক শক্তিমান বিশ্বাসের একটা-
রেজাল্ট ও অ্যাচিভমেন্ট কখনো তোমার কাজের মাহত্ম, গুরুত্ব, ওজন, মূল্য’র নির্দেশক না।
অ্যাওয়ার্ড, পাবলিক অ্যাপ্লাউড, পাবলিক চয়েজ, পপুলারিটি, পাবলিক রিকগনিশন, সাইটেশন-কোনোটাই আমার কাজের, কথার, বিশ্বাসের, লেখার, সৃষ্টি যাচাইয়ের কষ্টিপাথর না।
তুমি তোমার বিশ্বাস ও কাজ নিয়ে এগোও। ডোন্ট নোটিশ অর অ্যাটেন্ড দ্য বারকিং ডগস অর প্রেইজিং হোরস।
**একই বিষয় নিয়ে আমার একটি ভিডিও ক্লিপ দেখতে: https://youtu.be/xF9MeZVNihI?t=749
ওপরে ওঠার জন্য, অথবা, জীবনের তথাকথিত ‘সফলতা’ পাবার জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্প মাজহাব আছে। (’মাজহাব’ শব্দটি শুনেই যদি কোনো ‘কাঠগোল্লা’র চেতনাদন্ড জাগ্রত হয়ে যায়, তাহলে বলব, এটি স্রেফ একটি শব্দমাত্র, যার বাংলা হল পথ ও পন্থা।) আপনি যদি ওপরে উঠতে চান (না, ওপরে মানে একেবারে দেহত্যাগ নয়), অথবা ‘সফল’ (বিশেষত সফল পুরুষ) হতে চান, তাহলে কার্যত এরই যে কোনো একটি মাজহাব ধরে চলতেই হবে। তবে এই মাজহাবে সত্যিকারের ওপর (মানে উর্দ্ধাকাশের) জগতের নির্বান জড়িত নয়। এই নির্বান নেহাতই ’কামানা-পাকানা-খানা-পাখানা-পয়দানা-আর শো যানা’ জগতের নির্বান। ওপরের বা ওপাড়ের জগতের নির্বান খুঁজলে মুনমুনুল হকের সাথে গিয়ে জেলে দেখা করুন।
মোটা দাগে প্রতিষ্ঠা ও সফলতার মাজহাব ৪টি: –
ক. মাআরেফাত বা আধ্যাত্মিক লাইন: এই লাইনে যেতে হলে আপনার খুব বেশি ঝামেলা নেই। ওপরের সাথে ’ডায়রেক’ কানেকশন বানান। পীর-পয়গম্বর হয়ে যান। দরবেশ-সাধু-সন্ত-ঠাকুর-ঠাকুরাইন বনে যান। সত্যিকারে হলে ওপরওয়ালাই আপনার দায়ীত্ব নেবেন। ঘরে তাকিয়ায় বসে থাকবেন, আকাশ হতে আঙুর এসে মুখে ঢুকে যাবে। যেমনটা আওলিয়া-দরবেশদের ইতিহাসে আমরা পড়েছি। ইদানিং ফেকবুক আর লিংকডইন নামে কী যেন একটা বেরিয়েছে, সেখানেও অনেকে হরহামেশা নাকি বলেন, যে, ঘরে বসে থেকেও খাওয়া, শোয়া মিলে যাবার পথ নাকি মারফতি লাইনে মেলে। শোনেননি, আমাদের হাই-প্রোফাইল মাজারগুলোর পীরে মোদাচ্ছেরগণ কেউ মাছের পিঠে চড়ে চলতেন, কেউ আবার জ্বীনকে কচ্ছপ বানিয়ে দিতে পারতেন। এমনকি আপনি ভেকধারী পীর হলে ওপরের ঈশ্বর আপনাকে ব্যাকআপ না দিলেও, আপনার ফূঁ পাওয়ারের দাপটে নিচের দো-পেয়েদের জগত আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। উভয় ধরনেই নির্বান। আপনার রুজি, রুটি, ক্ষমতা নিশ্চিত।
খ. তরিকত: এই মাজহাব বেশ সহজ তবে মারাত্মক কার্যকর। এই পথে চলতে হলে আপনাকে পাওয়ার-পলিটিক্যাল পাওয়ার, গ্যাঙ পাওয়ার, মানি পাওয়ার, চাপা পাওয়ার, মাসল পাওয়ার-যে কোনো একটি হাসিল করতে হবে। বাকিটা ওরাই যা করার করে দেবে। মাঝখান হতে ওগুলোর যেকোনো একটির হাত ধরে আপনি মগডালে পৌছে যাবেন। হ্যা, শুরুতে ওগুলো হাতাতে আপনাকে কষ্ট করতে হবে। তবে চাপার পাওয়ারের বিকল্পও আছে। সেটার নাম ’পাওয়ার অয়েল’। কী? শুনেই গরম হয়ে গেলেন? না, তেল পড়া বুঝে নেবেন না। তেল পাওয়ার বা ম্যাসাজ পাওয়ার বলেছি। আপনার ভিতরে তেল দেবার গুন হাসিল করুন। সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি বুঝে তেল দেবার (গ্রিজও হতে পারে) ক্ষমতা রপ্ত করুন ও প্রয়োগ করুন। দুই ফাইলই যথেষ্ট। এই পথেও বহু মানুষ ব্যপক সফল হয়েছে। বাংলাদেশের কথা যদি বলেন, আমি এই মাজহাবের মুরীদই বেশি দেখি। সফলতার হারও মারাত্মক।
গ. হাকিকত: এই পথ বা মাজহাব হল “চেয়ে চেয়ে দেখলাম……..আমার বলার কিছু ছিল না” পথ। এখানে আপনাকে কিছু করতে হবে না। বা, আপনার কিছু করবার নেই। চুপচাপ পড়ে থাকবেন। জীবন যেমন যখন সামনে আসে, সেভাবেই কাটিয়ে দেবেন। কখনো বাপের হোটেলে, কখনো শশুরের হেশেলে, কখনো কপালে না জুটলে ফুটেলে (মানে ফুটপাতে)। বোহেমিয়ান জীবন বেঁছে নিন। ভাবনা নেই, টেনশন নেই, চাপ নেই, দায় নেই, টারগেট নেই, কিছু করবারও নেই। এই মাজহাবের নাম আসলে কপাল, কপালের নাম গোপাল। কপাল ভাল হলে ছক্কা পেটাবেন। ভাল না হলে ঊষা’র বাপ হবেন। আমার বাবা-মা যখন প্রথম জীবনে ঝালকাঠি থাকতেন, সেখানে একজন বুয়া তাদের কাজ করতেন, যার মেয়ের নাম ঊষা। তো, ঊষার বাবা কোনো কাজ করতেন না। সারাদিন মদ গেলা, গাঁজা সেবন আর ঘরের দাওয়ায় পড়ে পড়ে নিদ্রা। ঊষার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পেতেন, তা নিয়ে যেতেন। ঊষার বাবা ঘুম ভেঙে গোগ্রাসে সেই বাসি, পঁচা এঁটো পেট ভরে খেয়ে আবার হয় শুঁরিখানা, অথবা পায়খানা। এভাবেই চলছিল। কিছুদিন পরে ঊষার বিয়ে হল। মনে হল সুখের দিন বোধহয় এলো। না, বিধি বাম। ঊষার জামাইও শশুরের শিষ্য। কিছুকাল পরে দেখা গেল, সে-ও কাজকর্ম করে না। তাকে তার বাড়ি হতে খেদিয়ে দিল। ঊষা তার জোয়ান জামাই নিয়ে বাপের ভিটায়। এখন ঊষা আর ঊষার মা একইসাথে বুয়ার কাজ করে। আর ঊষার বাবা আর জামাই দু’জনে সেই পয়সায় শুরা খায়, ঘুরা খায়, ঘুমিয়ে দিন কাটায়।
কপাল বা মনুষ্য গোঁপালের ওপর ভর করে এরকম জীবন কাটানোর কথাও ভাবতে পারেন। ব্যপক সুখ।
ঘ. শরিয়াত: এই পথ একটু কঠিন এবং সফলতার হার আহামরি নয়। ওপরের তিনটাতে যদি ফেল মারেন কিংবা ওই পথে না যেতে চান, তাহলেই কেবল এই বন্ধুর পথে নামুন। তবে নিজ দায়ীত্বে, ফেল মারলে আমি দায়ী নই। তাছাড়া আবার বেশি ‘শরিয়াত বয়াতী’ বনে গেলে রাষ্ট্রের সহযোগীতায় মাইর খাবার সম্ভাবনাও থাকে। এই পথকে নিজের পথ করতে চাইলে নিয়মতান্ত্রীক হতে হবে।
অতীতের রথি-মহারথিগণ যেভাবে যেই গুণ ও যোগ্যতা অর্জন করে, যেই শ্রম দিয়ে, যেই কীর্তি গড়ে সফল হয়েছেন, যেই পথ তারা বাতলে দিয়ে গেছেন, সেগুলো পড়ে, বুঝে, মেনে, করেই আপনাকে সফল হতে হবে। আর হবে তো হবে, আপনাকে ওই গুন ও যোগ্যতায় অতি অবশ্যই সুপার হতে হবে। হাফটিকিট বা সিকি হলে ভাত নেই। এই মাজহাব হয় হিরো অথবা জিরো, করো অথবা মরো, নাউ অর নেভার। এই পথ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। একটু ব্যাকডেটেডও বটে। জীবন ত্যানা ত্যানাও হয়ে যেতে পারে। এই মাজহাবের সফলতার হারও তত নয়। এই পথে সবাই রবার্ট ব্রুস হন না। তবে এই পথটায় চললে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আছে।
জীবন আপনার। পথ বেঁছে নেবার দায় ও অধিকারও আপনার। ভেবে, চিন্তে পথ বেঁছে নিন। বাঁছার সময় একটু হিসেবী, সতর্ক, চুজি ও স্বার্থপর হোন। এই পথ বাঁছার সময়টাতে কেবলমাত্র নিজের চয়েজ, ভবিষ্যত, বাস্তবতা ও সক্ষমতাকে বিবেচনায় নেবেন। আর কিছু না। বিশেষত ‘নৈতিকতা’ নামের ফালতু হাইমেনকে একদম পাত্তা দেবেন না।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়্যীদ এর একটি উক্তি আমার খুব প্রিয়-”আমরা সবাই সফলতার পেছনে দৌড়াই, কিন্তু, কেউ স্বার্থকতার পেছনে দৌড়াই না।”
অর্জন, সফলতা ও স্বার্থকতার মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। আপনার সব অর্জনই সফলতা নয়। সব সফলতা স্বার্থকতা তো অবশ্যই নয়। ভাববার বিষয় হল, আপনি কোনটি চান? কোনটি আপনার আসল লক্ষ্য? আপনার যেই অর্জন শুধুমাত্র আপনাকেই উপকৃত করে-সেটি নেহাতই আপনার অর্জন, সেটি সফলতা নয়। আপনার যেই সফলতা কেবল আপনারই, অন্য বৃহত্তর জগত, মানবের জীবনকে যদি তা সমৃদ্ধ না করে, তাহলে সেটিকে আমি সফলতা মনে করি না। স্বার্থকতা তো অবশ্যই নয়।
আমার কাছে সফলতা ও অর্থপূর্ণ জীবন আসলে কী?
আমি জীবনে যখন যা হতে চেয়েছি, হা হতে পারা; যেমনটা হতে চেয়েছি ঠিক তেমনটা হতে পারা; নিজেকে যেমনটা দেখতে চেয়েছি-ঠিক তেমনটা দেখতে পাওয়াই সফলতা।
আর, আমি আমার জীবনকে, নিজেকে যেমন সফল দেখতে চেয়েছি, অন্যের জন্যও সেটা চাইতে পারা আর অন্যের কাছে তেমনটার স্বীকৃতি পাওয়া হল স্বার্থকতা।
থ্যাংকস গড, তিনি অনেকের আরাধ্য জীবন আমাকে দেন নাই। তিনি আমাকে আমার বোধের জীবনটা দিয়েছেন।
#success #accomplishment #fulfillment #friendship #education