অনেক দিন আগে মনের তরল অবস্থায় একটা লাইন লিখেছিলাম, It’s a new life বা ওই টাইপ কিছু। লোকে কত কিছু ভেবে নিয়ে অভিনন্দনের বন্যায় সিক্ত করেছেন। আদতে ঘটনা খুব ছোট্ট। বহুকালের জমানো কিছু অবাধ্য যন্ত্রনাকে টাটা বাই বাই করে দিয়েছি দীর্ঘ প্রচেষ্টায়। হঠাৎ মনটা ভাল ও ভারমুক্ত লাগতে শুরু করল। মনে হল, জীবন কত সুন্দর। ব্যাস আর কিছু না।
বন্ধূপ্রতীম হারুনকে কথা প্রসঙ্গে আজ বলছিলাম যেকোনো কিছু মেনে নিতে শেখাটাই সুখের উৎস। আসলেই। Avoid করতে পারা, Ignore করতে পারা, bothered না হওয়াও মানসিক শান্তির তিন সঞ্জিবনী।
অনেক আগে আরেক বন্ধুপ্রতীম শফিউল আযমকে কথা প্রসঙ্গে আমার মায়ের একটা কথা বলেছিলাম যেটা তিনি আমাকে তার মতো করে বলেছিলেন,
”সবসময় মাটির দিকে তাকাবে যাতে মনে থাকে, ওটা দিয়েই তুমি সৃষ্টি হয়েছ। কখনো কখনো আকাশে তাকাবে আর ভাববে, ওর চেয়ে তুমি বড় হওনি!!
আমি ওর সাথে আরেকটা কথা নিজেকে সবসময় বলি,
সাগরের কাছে যেও । ওর মতো সবকিছুকে ধারন করতে শেখো।
অনেক আগে হুমায়ন আহমদের মুভি শঙ্খনীল কারাগারের একটা সীন দেখে মনে গেঁথে ছিল। যেখানে আবুল হায়াত তার মেয়ে ডলি জহুরকে সাগর দেখাতে নিয়ে যান। সাগরের পাড়ে দাড়িয়ে মেয়ে ডলি জহুরকে বলেন, “পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ সাগরের পাড়ে দাড়াতে ভয় পায়। কেন জানো? কারন সাগরের পাড়ে দাড়ালে সে বুঝতে পারে সে নিজে কত ছোট।”
মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমাকে ইনবক্স করেন, “আমি কি আপনাকে এখন/অমুক সময়ে একটা ফোন করতে পারি?”
এনাদের বড় অংশকেই আগেই ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে, ফোন করবারই জন্য। তারপরও ওনারা সন্ত্রস্ত, ভীত, সংকুচিতভাবে জানতে চান, ফোন করবেন কিনা, কখন করবেন ইত্যাদি।
আমার ফোকাস হল তাদের এই জড়তা, ভীতসন্ত্রস্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে।
এটার মানে হল, এনারা ভীত। এনারা ইন জেনারেল (তথাকথিত) বড় ছ্যাড়দের চোটপাট, ভাবসাব, মেজাজ, মুড সুইংয়ের গোমরটা জানেন। এনারা জানেন, এই ছ্যাড়রা একটুতেই মাইন্ড খান, এঁদের রিচ করা এলন মাস্ক মেলার মতো, এনাদের ফোন করতে হলে কদমবুচিপূর্বক পূর্বানুমতি গ্রহনই রীতি। এমনকি এনারা ফোন ধরলেও অনুমতি নিতে হয় কথা শুরু করার জন্য। এনাদের ফোন করা ও তাদের সেটা ধরাটা বিশাল মহানুভবতার পরিচায়ক।
সেটা এরা জানেন বলেই এত সংকোচ।
আহ কর্পোরেট পদবী।
এমনকি আমি নিজেও কারো নম্বর চাইতে ভয় পাই, পাছে ঝামটা খাই। ফোন করলে জড়সড় বোধ করি, পাছে হুজুরের শানে গোস্তাকি হয়। ওনারাও খুব বরফ শীতলতার সাথে অ্যাটেন্ড করেন, “তো, কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন?”
নিজেদের কী ভয়াবহ মাত্রায় ভীতিপ্রদ ও অধরা করে তুললে আমরা নিজেরা নিজেকে বড় ভাবার তৃপ্তি পাই?
আমার একজন সাবেক সিনিয়র সহকর্মীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা মেসেজ পাঠিয়েছিলাম ১ তারিখে। মজার বিষয়, ভুল করে বাংলা মেসেজ পাঠিয়েছি।
অনেক অনেক সিনিয়র। আমি যখন জুনিয়র ম্যানেজার, তিনি তখনই ডিরেক্টর। এখন কনসালট্যান্ট।
ও মা! ঘন্টাখানিক পরে দেখি তিনি সুন্দর করে একটা রিপ্লাই দিয়েছেন। কাস্টমাইজড ও পারসোনালাইজড টেক্সট রিপ্লাই।
এতে অবাক হবার কী আছে?
তিনি একজন বিদেশী। অবাঙালি।
আমি তাকে ফিরতি প্রশ্ন করলাম, যে, তিনি বাংলা মেসেজ পড়লেন কীভাবে? (তিনি ভাল বাংলা বলতে পারেন।)
তিনি আমাকে হতবাক করে উত্তর দিলেন, কপি করে গুগল ট্রান্সলেটরে দিয়ে তিনি ইংরেজি করে নিয়ে পড়ে তারপর রিপ্লাই দিয়েছেন।
একজন সাবেক সহকর্মী, বিদেশী, প্রচন্ড সিনিয়র। তার এই বদান্যতায় অভিভূত হলাম।
এর বিপরীতে আমি অনেক অনেক ’বড়’কে দেখি। অনেক অনেক জুনিয়র ‘বড়’কেও দেখি।
আমরা ঠিক কতটা ’বড়’ হয়ে গেলে অধরা হয়ে পড়ি? রেসপন্স না করবার মতো ’বড়’ হতে কতটা ব্যস্ততায় ডুবতে হয় আমাদের?
জ্ঞানের ক্রাশ কে জানেন? বিনয়।
জ্ঞান সবচেয়ে কাছে চায় বিনয়কে। জ্ঞান চায় বিনয়কে সবসময় সাথে রাখতে, তার সাথে থাকতে। যেখানে সে থাকবে, সেখানে বিনয়ও যেন থাকে, যুগ যুগ তার সাথে কাটানোর ঐকান্তিক ইচ্ছা জ্ঞানের।
কিন্তু, এই ক্রাশ একতরফা। বিনয় তাকে পাত্তা দেয় কম। জ্ঞানের সাথে যেন তার অভিমানী কিংবা পলায়নরতা প্রেমিকার সম্পর্ক। জ্ঞান যতই তাকে কাছে টানে, জ্ঞানের যত বেশি তাকে দরকার, সে ততই ভাগে। জ্ঞান যেখানে থাকে, যার মধ্যে থাকে, বিনয় যেন তার দশ ক্রোশ দূরে ভাগতেই ভালোবাসে।
সেজন্যই বোধহয় মানুষের মধ্যে জ্ঞান ভর করলে বিনয় সেখান হতে গায়েব হয়ে যায়। জ্ঞানী ও বিনয়ী-এই যুগপৎ যেন তাই এক অমাবস্যার চাঁদ।
জ্ঞানের জোরপূর্বক দুই প্রেমিকা তাই অহংকার আর গর্ব। বিনয়, যার জন্য জ্ঞান অজ্ঞান, সে কাছে না আসায় অহংকার আর গর্ব জ্ঞানকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে।
মানুষের মধ্যে জ্ঞান যতই বাড়বে, সেই জ্ঞানের সাথে বিনয়, বোধ, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা ও যৌক্তিকতা বাড়বার কথা। যাকে বলা চলে প্রজ্ঞা। সেটাতো বাড়েই না। বরং জ্ঞানী মাত্রই অহংকারী ও উদ্ধত-সেটাই যেন বারবার প্রমাণিত হয়।
জ্ঞানী অথচ উদ্ধত, অসহিষ্ণু, অহংকারী-এই ত্রয়ীর দর্শন তাই আকছার করি। দর্শন করে নিরবে সরে আসি। জ্ঞানী হতে দূরে থাকি।
পদ, পদবী মানব চরিত্রে আরও আরও দায়ীত্বশীলতা, বিনয় আনয়নের কথা। যে গাছের ফল বেশি, সেটা ফলের ভারে নুয়ে পড়ার কথা। এখানে হয় তার উল্টো। বিনয় এই পোড়া দেশে এক চৈত্র দুপুরের এক চিলতে হাওয়ার মতো।
বিনয় আসলে কী?
বিনয় মানে হল উদ্ধত না হওয়া। অসত্যের মুখে হাত কচলানোর নাম বিনয় নয়। ফ্লেক্সিবিলিটি মানে হল গোয়াড় না হওয়া। অন্যের ইচ্ছের কাছে নিজেকে বলি দেয়ার নাম ফ্লেক্সিবিলিটি নয়। ভদ্রতা মানে হল নম্র থাকা। অন্যের অন্যায় দেখে লেজ গুটিয়ে চলে যাওয়া নয়। সহিষ্ণুতা মানে হল রিএ্যাকটিভ ডিসিশন না নেয়া। মাথা পেতে অন্যায় সহ্য করা নয়। সত্য মানে হল যা ঘটেছে তাই বলা। যা ঘটেছে তাকে নিজের মতো করে বর্ণনা করা নয়। সততা মানে হল সৎ চিন্তা করা। শুধু ঘুষ না খাওয়া নয়। চরিত্র মানে হল একা থাকাকালীন তেমন থাকা, যেমন মানুষের উপস্থিতিতে থাকি।
সাহস মানে হল ভয় না পাওয়া। নির্বোধের মতো বুক পেতে দেয়া নয়। মানবতা মানে হল মানবের জন্য সহমর্মী হওয়া । অন্যের হক হতে অন্যায্যভাবে তাকে কিছু দেয়া নয়।
এই লেখাটির প্রথম সূত্রপাত হয় নরসুন্দরের দোকানে। লেখার স্থান ও পারিপার্শ্বিকতা বিচারে খারাপ না। প্রথম জন্মের বহুকাল পরে লেখাটি পূর্ণতা পায়। বিশেষ একটা দিনে বিশেষ এক অসম্মানের মুখে।
নরসুন্দরের সিরিয়ালে বসে আছি মিনিট পনের। জনৈক ভদ্দরনোক তার লেদু লেদু পোলাকে নিয়ে ঢুকলেন। পোলা বছর ৫চেক বয়স। সে বাংলায় কথা বলতে পারে না। একটা চেয়ার খালি হল। আমার বসার কথা। তিনি একবারও আমাকে জিজ্ঞেস না করে তার পোলাকে বসিয়ে দিলেন সিরিয়াল ভেঙে। ভদ্রতা বা সিরিয়াল মানার কোনো বালাই নেই। আমি নিশ্চিৎ, এই ব্যাটাই আবার সমাজে শৃঙ্খলা আর ভদ্দরতার পিল বেঁচে।
বাংলাদেশের অনলাইন জগতে অতি দ্রূত জনপ্রিয়তা পাবার এবং রিচ পাবার মতো যেসব বিষয় রয়েছে, ’সততা’ তার মধ্যে বহুল কার্যকর একটি বিষয়। সততা নিয়ে একটা পোস্ট লিখুন, অথবা, অসততার একটা কেস হিস্ট্রি লিখুন-প্রচন্ড রিচ পাবেন। আমি অনেকবার একটা পরীক্ষামূলক জরিপ করেছি, যেখানে প্রশ্ন ছিল একই-দুজন চাকরিপ্রার্থীর আর সব যোগ্যতা সমান সমান হলে, যদি একজন সৎ কিন্তু অদক্ষ হন, আরেকজন অসৎ কিন্তু দক্ষ হন-কাকে হায়ার করবেন-এই প্রশ্নে প্রতিবারই প্রথমজন বিজয়ী হন বিপুল ভোটে।
একটা বড় সংখ্যক মানুষের (নারী/পুরুষ) ভিতরে, বিশেষত বাঙালি পুরুষের মধ্যে লালসা, কাম, লাম্পট্য, পারভারসন, স্থূল পছন্দ হাইবারনেট অবস্থায় থাকে।শুধু সুযোগ পেলেই লকলক করে ওঠে।ওৎ পেতে থাকে।চকিতে ঝাপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়।হোক সেটা কারো আদি রসাত্মক সাহিত্যের প্রেক্ষিতে, হোক কারো সাথে চায়ের আড্ডায়, হোক দেয়ালে সিনেমার পোস্টার দর্শনে। মহিলাদেরও আজকাল রগরগে বচন বিনিময় ও উপভোগে কম যেতে দেখিনা। কিন্তু আমরাই আবার ময়ুরীদের অশ্লীল বলে দূরে থাকি। কৃষ্ণ করলে লীলা কেষ্টা বেটা করলে কিলা।
কারনটা নিহিত সেই বেদবাক্যে: Virginity is not a matter of honesty.Rather it’s a matter of opportunity.
বাংলাদেশে আপামর মানুষের কাছে সততা এখনো একটি আলোচিত ও আমলযোগ্য টপিক। সারপ্রাইজিংলি, দুয়েকদিন আগে একটি প্রশ্ন ছেড়েছিলাম, যে, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ সৎ নাকি অসৎ বলে সাধারন দৃষ্টিতে মনে হয়, সেখানেও বড় সংখ্যক মানুষ ‘এখনো অধিকাংশ মানুষ সৎ’ বলেই তাদের ধারনা ব্যক্ত করেন।
ওয়েল, অনেকেই অবশ্য একটা কথা জুড়ে দিয়েছেন-সুযোগের অভাবে সৎ।
আমার ক্যাচটা ওখানেই। আমি কখনো অসততার কোনো ঘটনা ঘটাইনি, অথবা, আমার নামে অসততার রেকর্ড নেই-মানেই আমি সৎ-আমি এই ধারনার বিরোধী। কারন হতে পারে,
-আমি কখনো সেই সুযোগটাই পাইনি। অথবা,
-ভয়ে পড়ে করিনি। অথবা,
-আমি অলরেডি অসততা করেছি, তবে সেটা এত সুচারুভাবে, যে, কেউ জানেনি।
তিনটি ক্ষেত্রেই, জনারন্যে ও সমাজে আমি সৎ। আদতে আমি কিন্তু সৎ না।
এই ধারা ধরেই একটা অনুচ্চারিত বিষয় চলে আসে-চিন্তার সততা।
মূখ্যত, মাঠে-ঘাটে যে সততা নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি সরব-সেটা হল আর্থিক সততা বা লেনদেনের সততা, সামাজিক বিনিময়ে সততা। যেটাকে ইংরেজিতে ইনটেগ্রিটি বলে।
আর আমি কথা বলছি সততা তথা অনেস্টি নিয়ে। এই সততা বা অনেস্টি হল চিন্তার সততা। আর্থিক সততা শতভাগ থাকলেও মানুষ চিন্তায় অসৎ হতে পারে। এবং মূখ্যত, আর্থিক সততার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল চিন্তার সততা। চিন্তার সততা না থাকলে তার আর্থিক সততার ন্যুনতম দাম নেই। তার অবস্থা হল, সে ধর্ষক না, তবে সে ধর্ষকাম।
চিন্তার সততা আমাদের সমাজে খুব একটা আলোচনায় আসে না। কিন্তু, কার্যত ওটাই বেশি দরকার। চিন্তার সততা কী-সেটা একটু ঘাটলেই পাবেন। মোটা দাগে, চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে মিল রাখা, বায়াস ফ্রি চিন্তা, প্রতারনা, মিথ্যা, ছলনা, অভিনয় কিংবা অন্যের অনিষ্ট-এগুলো চিন্তা ও বিশ্বাসে স্থান না দেয়াই হল চিন্তার সততা। সুযোগের অভাব, অথবা, সাহসের অভাব নয়, বরং মানসিকভাবেই কেউ যদি সৎ হন, সেটাকে বলে চিন্তার সততা।
চিন্তার সততাকে মাপকাঠি ধরলে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সৎ, নাকি অসৎ-সেটি নতুন করে ভাবতে হবে।
#obey #life #avoid #ignore #happiness #stress #Upset #generosity #decency #politeness #modesty #generosity #honestyofthoughts #intelectualdishonesty #honesty #integrity #barbarshop #discipline #parvertion #filthy #waiting #TVserial #knowledge&modesty