বাংলাদেশে একটি খুব জনপ্রিয় কিন্তু সস্তা মিথ্যা কথা খুব চালু আছে এবং সেটা নিয়ে খুব প্রচারনাও আছে।
“বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের ন্যুনতম মজুরী বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক কম”-এরকম একটি আপাতঃ সত্যি তথ্য নিয়ে প্রচুর জ্ঞানী ও অতিজ্ঞানী গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য চোখের পানি ফেলেন। দিস্তা দিস্তা কলাম লেখেন। এটা বোধহয় এমন একটি একপেশে মিথ্যা যেটা মানুষ ব্যাপকভাবে পছন্দ করে-বলতে আর ভাবতে।
কারন একটাই-গার্মেন্টস শিল্পের প্রতি জন্মগত প্রিজুডিস। আমি কেন বলছি আপাতঃ সত্যি? আসুন দেখি:-
১. আয় ও প্রকৃত আয় বলে অর্থনীতিতে দু’টো কনসেপ্ট আছে। আমাদের দেশে এক লিটারের এক বোতল পানির দাম কত? ১৫-২০ টাকা। জার্মানীতে সেটা ১০০ টাকা। মানে হল, দেশের মূল্যস্তর ও লিভিং কস্ট এর উপর নির্ভর করে প্রকৃত আয়। বাংলাদেশে তাই ১৫,০০০ টাকা আয় হলে যেই জীবন যাপন করা যায় সেটাই জার্মানীতে করতে হলে ১,৫০,০০০ টাকা লাগবে। তাই ’জার্মানীতে সবার বেতন বেশি’-এটি শুধুই একটি আংশিক সত্যি।
২.মানুষের শুধুমাত্র ইনকামের উপর তার ক্রয়সামর্থ নির্ভর করে না। ওই দেশের মুদ্রার সাথে ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট, জিডিপি গ্রোথ, ইনফ্লেশন রেট, ফ্লো অব মানি, লিকুইড ফ্লো-অনেক কিছুই আধুনিক অর্থনীতিতে মানুষের সামর্থ্য নির্ণয়ে দরকার। ক্রয়সামর্থ ও ইনফ্লেশন রেট বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মজুরীর হার নিয়ে কথা বলা কুমিরের কান্নার মতো। একটা উদাহরন বলি: জিম্বাবুয়েতে একজন মাটিকাটা শ্রমিকের বেতন ১০০ কোটি জিম্বাবুইয়ান ডলার। তো, সে লোকটি নিশ্চই অনেক সুখে থাকে! নাহ, তিনি ওই দেশে খুবই গরীব কারন ওখানকার সুপার ইনফ্লেশন রেট। বাংলাদেশে এটা মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫% বিধায় এখানে ১০ কোটি নয়, ১০,০০০ দিয়েও ওর চেয়ে ভাল থাকা যায়।
৩.বাংলাদেশে গার্মেন্টস এত বিশাল কেন হয়েছে-তার পেছনে যতগুলি বিজনেস ফ্যাক্টর আমাদের তথাকথিত থিংকট্যাঙ্করা দেখাতে পেরেছেন তার সর্বপ্রধানটি হল সস্তা শ্রম। চায়না, ভিয়েতনাম, ফিলিপিনস, কম্বোডিয়া, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত- যাদের ন্যুনতম মজুরীর তুলনায় আমাদের মজুরী কম বলে এসব জ্ঞানপাপী থিঙ্কট্যাঙ্করা একতরফাভাবে প্রচার করে, সেসব দেশের সাথে আমাদের প্রতিযোগীতার প্রধানতম অস্ত্র সস্তা শ্রম। কারন অন্যান্য ফ্যাক্টরে আমরা অনেক পিছানো। এখন শুধুমাত্র ’মজুরী কম’-এইজন্য যদি মজুরী তাদের সমান বা কাছাকাছি করতে হয়, তাহলে যে একমাত্র ফ্যাক্টরে আমরা প্রতিযোগীতায় টিকে আছি সেটাও তো তাদের সমান হয়ে যায়। তাহলে জায়ান্ট চীন বা কম্বোডিয়ার সাথে টিকব কী করে? আর শিল্পটাই যদি না থাকে, তাহলে আপনাদের এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক, গবেষণা, শ্রমিকের বেঁচে থাকাইতো অসম্ভব।
৪.চায়না বা ভিয়েতনামের চেয়ে আমাদের ন্যুনতম মজুরী কম-তাই সেটা বাড়াতে হবে ব্যপক হারে-এই কুকথা যারা নির্দিধায় বলে বা বিশ্বাস করে তাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, চায়না, ইন্ডিয়া বা ভিয়েতনামের জিডিপি কত আর বাংলাদেশের কত? যদি আমাদেরটা অনেক কম হয়ে থাকে তাহলে একই রকম শিল্পে আমাদের মজুরী তাদের সমান করার দাবীটাইতো অন্যায্য।
৫.যাদের সাথে মজুরী তুলনা করা হচ্ছে তাদের দেশে তৈরী হওয়া প্রোডাক্টের এফওবি, সিএম আর ভ্যালু অ্যাডিশনের বিপরীতে আমাদের এখানকার গড় এফওবি, সিএম ও ভ্যালূ অ্যাডিশন কত সেটা তুলনা করেন। ৬.থিঙ্কট্যাঙ্কদের ভন্ডামীর আরেকটা দিক বলি? এরা শুধু গার্মেন্টসের ন্যুনতম মজুরী নিয়ে কথা বলে। দেশে কি শুধু গার্মেন্টসই একমাত্র শিল্প্ বা শুধু এখানেই কি কম বেতন দেয়া হয়? বাকি শিল্পে কি কাড়ি কাড়ি টাকা দেয়া হয় শ্রমিককে? যদি তাই হয় তবে গার্মেন্টসের ৫০ লক্ষ শ্রমিকের বিপরীতে বাকি হাজারো শিল্পে মোট শ্রমিক কেন কম তার ব্যাখ্যা দিন। আর ওদের ন্যুনতম মজুরী কত? যে পত্রিকাওলারা এত মায়াকান্না করে তাদের ওয়েজবোর্ড আইন অনুযায়ী নিয়মিত দেয়তো? আর যুক্তি দেব না। ভাই, এই সেক্টরটি নিখাঁদ নিজের চেষ্টায় বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের প্রায় প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। ওইসব তথাকথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক, মানবতা কর্মী, এনজিও, কল্যান ফেডারেশন, আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা, সস্তা চিন্তার গবেষক, ফ্রাস্টেটেড গার্মেন্টস কর্মী-এরা আপনাকে বিশ্লেষনধর্মী সত্যিটা দেয়না। দেয় প্রিজুডিসড তথ্য। নিজের সুবিধা ও ইচ্ছামতো।
মিনিমাম ওয়েজ রিভিউয়ের সময়টা এলেই, একটি বিষয় খুব জোরেসোরে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। হ্যা, সারাবছরই আলোচনাটা চলমান থাকে, তবে ততোটা জোরালো বা সরগরম আকারে নয়।
তর্কের বা আলোচনার ফোকাসটি হল-
মিনিমাম ওয়েজ বাস্তবায়নের পরে/ফলে (বিশেষত এবার ২০২৩ এ), সর্বোচ্চ ধাপে থাকা একজন দক্ষ শ্রমিক বা ওয়ার্কার (আসলে কর্মী) এর বেতন দাড়াতে পারে ১৪,৭৫০ টাকা, যা ওভারটাইম ও আরও কিছু আয় যুক্ত হলে দাড়াবে মাসিক আয় আনুমানিক ১৮,০০০-১৯,০০০ টাকায়।
এখন, আমাদের অনেকেরই গ্রীভ্যান্স বা দুশ্চিন্তা দাড়িয়েছে যেটা, তা হল,
”একটা অশিক্ষিত গারমেন শোরমিকের ব্যতন যদি ১৯ হাজার টাকা অয়”, তাহলে একজন ফ্রেশার অথবা স্বল্প অভিজ্ঞ ও নিচের দিককার জুনিয়র অফিসারের ন্যুনতম বেতন কত হওয়া উচিত?” প্রশ্ন করলেও উত্তরটাও প্রকাশিত, সেটা হল, এনাদের মিনিমাম বেতন অবশ্যই অবশ্যই ওই সর্বোচ্চ ধাপের শ্রমিকের বেতন হতে বেশিই হতে হবে।
কারণ? কারণ, তারা স্টাফ, তারা হোয়াইট কলার, তারা শিক্ষিত, তারা বস, তারা সুপারভাইজার, তারা সুপেরিয়র, তারা আপারহ্যান্ড, তারা উঁচু। (বিদ্যমান ন্যারেটিভের আলোকে বললাম।) এই আলোচনা কেবলমাত্র RMG সেক্টরের ক্ষেত্রেই-তা ভাবলে ভুল হবে। সব সেক্টরেই এখন তুলনাটি ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে। এই গতকালও সেই প্রশ্নটি আমি তুলে ধরেছিলাম-”শ্রমিকের আয় ১৯ হাজার হলে এম.বি.এ ধারীর বেতন কী করে ১২ হাজার হয়?” [অনলাইন প্লাটফরমগুলোতে প্রায়শই একটি হাহাকার বা অনুযোগ ঘুরতে দেখি। সেটা হল-
“একজন রিক্সাওয়ালার মাসিক আয় যেখানে ৩০ হাজার টাকা, একজন ‘*অশিক্ষিত’ গারমেন্টস ওয়ার্কারের মাসিক বেতন যদি হয় ১৫ হাজার, একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতার মাসিক আয় যখন ৫০ হাজার টাকা; তখন একজন MBA ধারী ‘*শিক্ষিত’ ফ্রেশারের বেতন কীভাবে ৮/১২ হাজার টাকা অফার করা হয়?”
দেখার বিষয়, এখানে MBA এর তুলনাটি যাদের সাথে হচ্ছে, তারা সবাই স্কিলড, experienced এবং তাদের ভ্যালু প্রপোজিশনটি প্রোভেন।
MBA ধারী fresher, তার স্কিল থাকতেও পারে, তবে তা এখুনি নিশ্চিত, প্রমানিত বা সুপার রেলেটেবল নয়। ভবিষ্যতে সে অবশ্যই (সব ঠিক চললে) ভ্যালু অ্যাডেড হবার কথা। তদুপরি, এই অনুযোগের উমেদাররা সবচেয়ে বড় ভুল যেটা করছেন, তা হল, তারা ডিগ্রীকে যোগ্যতার ও মূল্যায়িত হবার একমাত্র ফ্যাক্টর ভাবছেন। আমরা দীর্ঘকাল ধরে কোয়ালিফিকেশন কথাটাতে অভ্যস্ত। আমরা কোয়ালিফিকেশন বলতে একাডেমিক ডিগ্রীকেই প্রতিশব্দ হিসেবে দেখি। ফলে, হায়ার ডিগ্রী হলে হায়ার ভ্যালু চাইছি। কিন্তু, এমপ্লয়ারদের কাছে একাডেমিক ডিগ্রী ওয়ান অব দ্যি কোয়ালিফিকেশনস, ওয়ান অ্যান্ড ওনলি নয়। তাদের কাছে কোয়ালিফিকেশন বা এমপ্লয়্যাবিলিটি কমপিটেন্সি একটা কমপ্রিহেনসিভ বিষয়, যা অনেকগুলো ফ্যক্টর বা নর্মসের সমন্বিত রূপ।
তাহলে, বর্তমানের এই অনুযোগটি কি একাডেমিক ডিগ্রীকে স্কিল, experience ও ভ্যালু প্রপোজিশনের ওপর সুপ্রিমেসি দেবার দাবী করছে? মানে, ডিগ্রীধারী যাই হোন, তার আয় *অশিক্ষিত কিন্তু স্কিলড লোকের চেয়ে কম দেয়াটা অন্যায্য?
কর্মক্ষেত্রে একাডেমিক ডিগ্রী কি রেলেভেন্ট কমপিটেন্সির চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবার ন্যায্য ও অবশ্যম্ভাবি দাবীদার?]
এখন প্রশ্ন হল, শ্রমিকের (আসলে কর্মীর) বেতন হতে স্টাফের বেতন অবশ্যই ওপরে থাকতে হবে, বা, ব্লু কলার কর্মীর বেতনের চেয়ে হোয়াইট কলারের বেতন কম হতে পারবে না, বেশি শুধু না, ভাল রকম বেশি হতে হবে-এই জনদাবী কতটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত?
এখানে একটি বিষয় প্রনিধানযোগ্য। তা হল, চাকরিজীবি হিসেবে আপনি হয় মেধা বিক্রী করছেন, অথবা শ্রম। কোন প্রতিষ্ঠান কোনটির মূল্যায়ন কেমন করবে, বা, করার কথা-সেটি অনেক কিছুর ওপরে নির্ভর করে। বেতন নির্ধারন কেবলমাত্র যোগ্যতার ওপর ভর করে হয় না। আর আরও মজার বিষয় হল, একটি একক সেক্টর বা কিছু পজিশনের মিনিমাম মজুরী নির্ধারনের উদ্যোগটি ইটসেলফ ইজ নট এনিথিং ওয়াইজ অ্যান্ড রিয়েলিসটিক। এটা প্রফেশনাল কাজও নয়।
আর যদি এটা করতেই হয়, তাহলে মিনিমাম যোগ্যতারও ম্যট্রিক্স করে দেয়া দরকার। সেই সাথে, দেশের সব রকম কনজ্যুমার পণ্য বা সেবার দামও ফিক্স করে দিতে হবে।
অন্যথায়, এটা স্রেফ একটা হাওক্স, এবং, এটা কাজ করবে না।
আমি কোনো ন্যারেটিভ বলছি না। আলোচনাটি উন্মুক্ত রাখছি। সবার মতামতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে।
আমাকে মালিকদের দালাল ভাববেন না। আমাদের সেক্টরের অনেক সমস্যা আছে। অনেক বঞ্চনা আছে। মজুরী, পাওনা নিয়ে সত্যিই অনেক সমস্যা আছে। আমি শুধু বলছি, একপেশে তথ্য নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে। সর্বোপরি আমাদের যেকোনো মূল্যে সেক্টরটাকে যেমন করেই হোক আগে বাঁচাতে হবে। সে বেঁচে থাকলে কমপ্লায়েন্স, ভাল মজুরী, উন্নত জীবন, দারুন পরিবেশ, ক্যারিয়ার, উন্নয়ন চিন্তা, এনজিও আন্দোলন, মানবতা চর্চা-সব হবে। সেক্টর যদি অবিমৃষ্যকারীতার কারণে মরে যায় তবে কাকে নিয়ে দেশ চালাবেন? তখন কমপ্লায়েন্স রক্ষা করে আমিসহ এই ৫০ লক্ষ শ্রমিকের রাস্তার মোড়ে খদ্দের ধরার ব্যবস্থা করতে পারবেন তো ভন্ড মানবতাবাদীরা?
#minimumwage #RMGsector #garment #hypocrisy #hypocritenation