”হাসান, আজ তোমার যেতে দেরী হবে। সন্ধার পর তোমাকে নিয়ে একটা জরুরী চিঠি লিখাতে চাই।” হাসান একটা ধাক্কা খায়। আজ তার ২য় বিবাহ বার্ষিকী। সন্ধায় নীতুকে নিয়ে তার বাইরে খেতে যাবার কথা। আর সন্ধার আগে আগে তার এমডি সাহেবের এই বাণী। মনে মনে শাপশাপান্ত করলেও মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখল সে। “কি হাসান, কোনো সমস্যা?” ‘জ্বি? না না স্যার, আমি থাকতে পারব, কোনো সমস্যা নেই”। সে এমডির রুম ছাড়ল। এমডি সাহেব হাসানের আদ্যোপান্ত রিঅ্যাকশনটা বুঝতে পারলেও মুখে কিছু বললেন না।
সন্ধ্যার পরে হাসান এমডির রুমে যাবার অপেক্ষা করছে। হাসান দু’বার ফোন দিয়েছিল কিন্তু স্যার বলে দিয়েছেন সময় হলে তিনি ডাকবেন। সবাই অলরেডী বাসায় চলে গেছে। সে ব্যজার মুখে স্যারের রুমের দিকে নিজেই যাবে কিনা ভাবছে…………………..“হ্যা, হাসান, শুরু করতো” হাসান ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে এমডি স্যার তার ডেস্কে। পরিমরি করে সে উঠতে যেতেই এমডি সাহেব তাকে নিবৃত্ত করলেন। জোর করে তাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজে হাসানের ডেস্কে হেলান দিয়ে ডিক্টেশন দেয়া শুরু করলেন। মাঝে হাসানকে লজ্জায় ডুবিয়ে নিজেই দু’কাপ কফি বানিয়ে আনলেন। প্রাইভেট কোম্পানীর সামান্য অফিসার হাসান তার এমডির এহেন বদান্যতায় মুগ্ধ।
হাসানের কাজ শেষ হতে হতে রাত ৮টা বাজল। এতক্ষণে নীতু নির্ঘাত রেগে কাঁই হয়ে আছে। হাসান নীতুর অগ্নিমূর্তির ছবিটা চোখের সামনে দেখতে দেখতে ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। মতিঝিল হতে মিরপুর পৌছাতে তার আরো কমসে কম ঘন্টা দুয়েক লাগার কথা। হঠাৎ পিএবিএক্সে এমডি সাহেবের ফোন, “তুমি নিচে যাও, আমি আসছি, তোমাকে ড্রপ করে দেব”।
এমডি সাহেব হাসানকে তার গাড়িতে মিরপুর ১১ নম্বরের বাসায় পৌছে দিলেন। হাসানের জন্য বিস্ময়ের উপর বিস্ময় ঘটল যখন মাঝপথে এমডি স্যার গাড়ি থামিয়ে তাকে নিউট্রিয়েন্টের কেক শপে কেক নিতে পাঠালেন। আর তারো আগে শাহবাগ পার হবার সময় একগোছা ফুল। হাসান ভাবছিল স্যার বাসা পর্যন্ত এসেছেন,তাকে বাসায় আমন্ত্রণ করা উচিৎ আবার সন্ধা থেকে সেজেগুজে বসে থাকা নীতু কীভাবে রিঅ্যাক্ট করে এই ভেবে সে দোনোমোনো করছিল। মেয়েটা বড় অভিমানী। আবেগে স্যারের সামনে কি করে বসে কে জানে?
তাকে অবাক করে দিয়ে এমডি স্যার বললেন, ‘কি হাসান, বাসায় যেতে বলবে না?” হাসান ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনো মতে লজ্জা কাটিয়ে স্যারকে নিয়ে তার ২ কামরার ফ্ল্যাটের দরজায় এসে বেল বাজায়। নীতু দরজা খুলল। হাসানকে দেখেই একটা রাম চিৎকার দিতে যাচ্ছিল কিন্তু অপরিচীত কাউকে দেখে আপাতত সামলাল।
হাসানের এমডি মি. আজমল সাহেব কিছুক্ষণ থাকলেন, নীতুর হাতে অসময়ে চা খেলেন। হাসানদের ঘর গোছানোর প্রশংসা করলেন। হাসানের জন্য সবচেয়ে বড় যে বিস্ময়ের ধাক্কাটা অপেক্ষা করছিল তার জন্য সে বা নীতু একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। যাবার আগে আগে এমডি সাহেব নীতুকে ডাকলেন।
“শোনো নীতু, হাসানকে আমি আটকে রেখেছিলাম একটা জরুরী কাজে। পরে আমি আমার পিএসের কাছে শুনলাম ওর আজ আগে যাবার কথা অ্যানিভার্সারী উপলক্ষে। আমি স্যরি, তোমাদের আনন্দ মাটি করলাম। আসলে চিঠিটা খুব জরুরী ছিল। যাহোক, এই খামে দু’টো ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা এয়ার টিকেট আছে। হাসানকে ৩ দিনের বিশেষ লিভ দিলাম। যতদুর জানি তুমি বেড়াতে খুব একটা অপছন্দ কর না।”
এমডি সাহেবের ঠোটের কোণে এক চিলতে হাসি। হাসান বা নীতু কেউই এটার জন্য একদম রেডী ছিল না। হরবর করে হাসান তোতলাতে তোতলাতে (বেশী এক্সাইটেড হলে হাসানের তোতলানোর স্বভাব আছে) বলতে গেল, ‘স্যার……….. ইয়ে মানে…….. কী বলে যে……..? ইত্যাদি ইত্যাদি। এমডি স্যার হাত তুলে তাকে থামালেন।
“চল, এবার বেরোতে হয়, রাত অনেক হল”।
তিনি বের হয়ে গেলেন। হাসান নীতুর দিকে তাকাল, নীতু হাসানের দিকে। দু’জনে কতক্ষণ চুপচাপ থাকল, তারপরই হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে হাসানের দম বন্ধ হবার যোগাড়। নীতু হাসানকে ধাক্কা দিতে লাগল। এই হাসান, হাসান, হাসান…………….সান……….সা…….।
”স্যার, বাসায় যাইবেন না”। হাসান চোখ ডলতে ডলতে দেখে পিয়ন জয়নাল তাকে ডাকছে বিরক্ত মুখে। হাসানের কিছুক্ষণ সময় লাগে কী ব্যপার তা বুঝতে। হাসান ঘড়ি দেখে, ৯টা বেজে গেছে। মোবাইলে নীতুর ৮টা মিসড কল।
এরপরের ঘটনা অতি সংক্ষেপ। রাত ৯টায় জয়নালের ডাকে হাসানের ঘুম ভাঙল। সে ধরফর করে উঠে বসে।
“এমডি স্যার”? হাসানের চোখ জিজ্ঞাসা।
”সে তো একটু আগে বাইর হইয়া গেল, বইলা গেল আইজ নাকি তার মুড আসতেছে না, কাইলকা আপনেরে কাম দিব। আপনেরে চইলা যাইতে কইল। আপনে বাসায় যাইবেন না?” হাসান বাসায় দিকে রওনা হয়। সে রাতে হাসান কী করে নীতুকে ম্যানেজ করে সে কাহিনী না হয় নাই শুনলেন। এমনি করেই হাসানরা দিনের পর দিন জীবন হতে জীবন হারায়। আর তাদের জীবনের দামে বড়রা আরো বড় হতে থাকে।
#corporate #happiness #worklifebalance #love #romance