বারী সিদ্দিকীর কিছু ভিডিও দেখছিলাম আর হাত কামড়াচ্ছিলাম। বারী সিদ্দিকী যদি ভারতের মানুষ হতেন তবে আমি নিশ্চিৎ, তিনি হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার মতোই পপুলার হতেন। এত সুন্দর বাঁশি বাজানোর প্রতিভা কতটুকু মূল্য পেলো এদেশে? যার গান শুনলেই চোখ ভিজে ওঠে, এমন দরদ নিয়ে গান গাইতে পারে কোন দেশের কোন গায়ক?
বঙ্গবন্ধুর যাদুময় ভাষনের স্বীকৃতি দিল ইউনেস্কো মাত্র সেদিন অথচ পৃথিবীর কারো স্বীকৃতি ছাড়াই ওটি সারা পৃথিবীর একটি সম্পদ। আজ এই ৪৬ বছর পরেও মাইকে, টিভিতে ওই ভাষণ শুনলেই শরীরের রোম দাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ তার এই সম্পদ ও ঐশ্বর্যকে কেন আগে বিশ্বায়ন করতে পারল না। কেন আরো আগে আদায় করার ব্যবস্থা করতে পারল না।
ফরিদা পারভীন যে ঐশ্বরিক মায়া ও ইন্দ্রজাল নিয়ে লালন গান করেন, বিশ্বব্রহ্মান্ডে আমি তো কোথাও তার জুড়ি দেখি না। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি। টিউশনির পয়সায় জীবন চালাই। বিনোদন বলতে মল চত্বর, টিএসসির মুফতে বিনোদন। এমনি একদিন যাদুঘরের মিলনায়তনে লালন গায়িকা ফরিদা পারভীনের একক সঙ্গীত সন্ধ্যা। মুফতে। সময় ব্যবস্থা করে গান শুনতে গেলাম। ফরিদা পারভীন আপা তার সূরের যাদুর মায়াজাল বিস্তার করে একটার পর একটা লালনসহ অন্যান্য গান দিয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করলেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছিলেন তিনি। তার সঙ্গীত জীবন নিয়ে নানা কথা। তার স্বামীর তার গান ও সঙ্গীতজীবন নিয়ে আপত্তি, অমিলের কথা। লালন সঙ্গীত নিয়ে আমাদের এককালের নাক সিঁটকোনো আর হালের উন্মাদনার কথা। একফাঁকে তিনি তার সঙ্গীত জীবনের একটি স্মরনীয় গল্প বললেন। একবার তিনি সঙ্গীত ভ্রমনে ডেনমার্ক (কিংবা স্পেন) গেছেন। একটি বড়সড় আসরে গান গাইবেন। নির্দিষ্ট সময়ে গানের আসর শুরু হল। সেই আসরে গান শুনতে এসেছেন ডেনমার্কের (কিংবা স্পেনের) রাণী। অন্যান্য শ্রোতাদের সাথে তিনিও তন্ময় হয়ে লালন শুনছেন। গান শুনতে শুনতে কখন যেন তার দু’গাল বেয়ে পানির ধারা বয়ে যাচ্ছিল। গান শেষ হলে শ্রোতারা রাণীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তো বাংলা গানের কথা বুঝতে পারছেন না। তাহলে কাঁদছেন কেন?” রাণী উত্তর দিলেন, “পৃথিবীর সবদেশেই সঙ্গীতের সুরের নিজস্ব একটি ভাষা ও আবেদন আছে। কথা বা লিরিক না বুঝলেও সেই আবেদন হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। ওই সুরের ভাষাই শ্র্রোতাকে গানের মর্ম বুঝিয়ে দেয়।”
নভেরার ভাষ্কর্য, এফ আর খানের ডিজাইন, জয়নুলের শিল্পস্বত্ত্বা, সুলতানের রহস্যময় শিল্পকর্ম, হাসনের সূফি ঘরানার সৃষ্টি, হুমায়ুন আহমেদের গণমানুষের গল্পকথা, একজন রুনা লায়লার মোহনীয় কন্ঠস্বর, একজন জহীর রায়হানের চলচিত্র জ্ঞান, একজন আহমদ ছফার তেজস্বিতা, একজন মোনাজাত উদ্দিনের মতো নির্ভিক ও নির্মোহ সাংবাদিকতা, আরো আরো হাজারখানিক নাম নিতে পারব।
এই প্রতিভার ঠিক কী মূল্য আমরা আদায় করতে পেরেছি পৃথিবী হতে? কতটুকু জানে পৃথিবী আমাদের বঙ্গ প্রতিভার? যারা চলে গেছেন তাদের শূন্যস্থান কতটা পূরণ হচ্ছে বাংলাদেশ? প্রতিটি সেক্টরে বাংলার প্রথম প্রজন্মের যে মনিষী, বিরল প্রতিভাধররা বিদায় নিয়েছেন, তাদের স্থানে কেমন প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে বাংলাদেশ? নিকট অতীতে ঠিক কতজন জাতীয় প্রতিভা, জাতীয় বীর, দেশের মাথার তাজ চলে গেছেন শেষ বিদায় নিয়ে, তাদের শূন্যস্থান কারা নিচ্ছেন?
১৯৭১ এ আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ মেধাদের একদফা হারিয়েছি অকালে। জাতি হয়ে গিয়েছিল মেধাশূন্য। যতটা ছিল, তারাও একে একে বিদায় নিচ্ছেন। বাংলাদেশ কি পাচ্ছে বা পাবে তাদের যোগ্য উত্তরসূরী? কারা হবেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পরবর্তি বাংলাদেশের প্রতিভার কান্ডারী?
#merit #talentgap #genious #IntellectualExcellence #EndOfGreats