সারাক্ষণ ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করেই যাচ্ছি। ভাবছেন, ক্যারিয়ারিস্ট তো হয়েই গেলাম। তা, নিজেই কি জানি, ক্যারিয়ার বিষয়টা কী?
ক্যারিয়ার মানেই চাকরি নয়, ব্যবসা নয়। ক্যারিয়ার মানে কী?
প্রকৃত অর্থে ক্যারিয়ার হল, আপনার একটি কর্মময়, ব্যস্ত, অর্থপূর্ণ ও স্বার্থক পুরো জীবন। আর তার সাথে বলব, আপনি যা হতে চেয়েছিলেন, যেমনটা নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন, নিজের যেই বিশ্বাস, বোধ, দৃষ্টি, রুচী, অর্জন পেতে চেয়েছিলেন আর ওগুলোকে সত্যি করে তুলবার জন্য যেই পন্থায় জীবনকে প্রবাহিত করতে চেয়েছিলেন, সেটি করার পথ ও পথচলাকেই আমি বলি ক্যারিয়ার।
কী? গোলমেলে লাগছে?
সহজ করে বললে, আপনি নিজেকে যেই ভূমিকায় দেখতে চান, যেটা করা আপনার স্বপ্ন, যেটাতে নিজেকে বেস্ট মনে করেন-সেটা নিয়েই জীবনকে অর্থবহ করে তোলার যাত্রাপথ ও পুরো জীবন হল ক্যারিয়ার। চলমান অর্থে আমরা পেশাদারীত্বের ভিত্তিতে যেকোনো পন্থায় অর্থ উপার্জনকেই ক্যারিয়ার বলে থাকি।
মূলত, আমরা যার যার পেশাকেই ক্যারিয়ার বলে থাকি।
যদিও বাংলাদেশে ক্যারিয়ার বললেই মানুষ মনে করে, ‘চাকরি’।
ওপরে ওঠার জন্য, অথবা, জীবনের তথাকথিত ‘সফলতা’ পাবার জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্প মাজহাব আছে। (’মাজহাব’ শব্দটি শুনেই যদি কোনো ‘কাঠগোল্লা’র চেতনাদন্ড জাগ্রত হয়ে যায়, তাহলে বলব, এটি স্রেফ একটি শব্দমাত্র, যার বাংলা হল পথ ও পন্থা।) আপনি যদি ওপরে উঠতে চান (না, ওপরে মানে একেবারে দেহত্যাগ নয়), অথবা ‘সফল’ (বিশেষত সফল পুরুষ) হতে চান, তাহলে কার্যত এরই যে কোনো একটি মাজহাব ধরে চলতেই হবে। তবে এই মাজহাবে সত্যিকারের ওপর (মানে উর্দ্ধাকাশের) জগতের নির্বান জড়িত নয়। এই নির্বান নেহাতই ’কামানা-পাকানা-খানা-পাখানা-পয়দানা-আর শো যানা’ জগতের নির্বান। ওপরের বা ওপাড়ের জগতের নির্বান খুঁজলে মুনমুনুল হকের সাথে গিয়ে জেলে দেখা করুন।
মোটা দাগে প্রতিষ্ঠা ও সফলতার মাজহাব ৪টি: –
ক. মাআরেফাত বা আধ্যাত্মিক লাইন: এই লাইনে যেতে হলে আপনার খুব বেশি ঝামেলা নেই। ওপরের সাথে ’ডায়রেক’ কানেকশন বানান। পীর-পয়গম্বর হয়ে যান। দরবেশ-সাধু-সন্ত-ঠাকুর-ঠাকুরাইন বনে যান। সত্যিকারে হলে ওপরওয়ালাই আপনার দায়ীত্ব নেবেন। ঘরে তাকিয়ায় বসে থাকবেন, আকাশ হতে আঙুর এসে মুখে ঢুকে যাবে। যেমনটা আওলিয়া-দরবেশদের ইতিহাসে আমরা পড়েছি। ইদানিং ফেকবুক আর লিংকডইন নামে কী যেন একটা বেরিয়েছে, সেখানেও অনেকে হরহামেশা নাকি বলেন, যে, ঘরে বসে থেকেও খাওয়া, শোয়া মিলে যাবার পথ নাকি মারফতি লাইনে মেলে। শোনেননি, আমাদের হাই-প্রোফাইল মাজারগুলোর পীরে মোদাচ্ছেরগণ কেউ মাছের পিঠে চড়ে চলতেন, কেউ আবার জ্বীনকে কচ্ছপ বানিয়ে দিতে পারতেন। এমনকি আপনি ভেকধারী পীর হলে ওপরের ঈশ্বর আপনাকে ব্যাকআপ না দিলেও, আপনার ফূঁ পাওয়ারের দাপটে নিচের দো-পেয়েদের জগত আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। উভয় ধরনেই নির্বান। আপনার রুজি, রুটি, ক্ষমতা নিশ্চিত।
খ. তরিকত: এই মাজহাব বেশ সহজ তবে মারাত্মক কার্যকর। এই পথে চলতে হলে আপনাকে পাওয়ার-পলিটিক্যাল পাওয়ার, গ্যাঙ পাওয়ার, মানি পাওয়ার, চাপা পাওয়ার, মাসল পাওয়ার-যে কোনো একটি হাসিল করতে হবে। বাকিটা ওরাই যা করার করে দেবে। মাঝখান হতে ওগুলোর যেকোনো একটির হাত ধরে আপনি মগডালে পৌছে যাবেন। হ্যা, শুরুতে ওগুলো হাতাতে আপনাকে কষ্ট করতে হবে। তবে চাপার পাওয়ারের বিকল্পও আছে। সেটার নাম ’পাওয়ার অয়েল’। কী? শুনেই গরম হয়ে গেলেন? না, তেল পড়া বুঝে নেবেন না। তেল পাওয়ার বা ম্যাসাজ পাওয়ার বলেছি। আপনার ভিতরে তেল দেবার গুন হাসিল করুন। সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি বুঝে তেল দেবার (গ্রিজও হতে পারে) ক্ষমতা রপ্ত করুন ও প্রয়োগ করুন। দুই ফাইলই যথেষ্ট। এই পথেও বহু মানুষ ব্যপক সফল হয়েছে। বাংলাদেশের কথা যদি বলেন, আমি এই মাজহাবের মুরীদই বেশি দেখি। সফলতার হারও মারাত্মক।
গ. হাকিকত: এই পথ বা মাজহাব হল “চেয়ে চেয়ে দেখলাম……..আমার বলার কিছু ছিল না” পথ। এখানে আপনাকে কিছু করতে হবে না। বা, আপনার কিছু করবার নেই। চুপচাপ পড়ে থাকবেন। জীবন যেমন যখন সামনে আসে, সেভাবেই কাটিয়ে দেবেন। কখনো বাপের হোটেলে, কখনো শশুরের হেশেলে, কখনো কপালে না জুটলে ফুটেলে (মানে ফুটপাতে)। বোহেমিয়ান জীবন বেঁছে নিন। ভাবনা নেই, টেনশন নেই, চাপ নেই, দায় নেই, টারগেট নেই, কিছু করবারও নেই। এই মাজহাবের নাম আসলে কপাল, কপালের নাম গোপাল। কপাল ভাল হলে ছক্কা পেটাবেন। ভাল না হলে ঊষা’র বাপ হবেন। আমার বাবা-মা যখন প্রথম জীবনে ঝালকাঠি থাকতেন, সেখানে একজন বুয়া তাদের কাজ করতেন, যার মেয়ের নাম ঊষা। তো, ঊষার বাবা কোনো কাজ করতেন না। সারাদিন মদ গেলা, গাঁজা সেবন আর ঘরের দাওয়ায় পড়ে পড়ে নিদ্রা। ঊষার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পেতেন, তা নিয়ে যেতেন। ঊষার বাবা ঘুম ভেঙে গোগ্রাসে সেই বাসি, পঁচা এঁটো পেট ভরে খেয়ে আবার হয় শুঁরিখানা, অথবা পায়খানা। এভাবেই চলছিল। কিছুদিন পরে ঊষার বিয়ে হল। মনে হল সুখের দিন বোধহয় এলো। না, বিধি বাম। ঊষার জামাইও শশুরের শিষ্য। কিছুকাল পরে দেখা গেল, সে-ও কাজকর্ম করে না। তাকে তার বাড়ি হতে খেদিয়ে দিল। ঊষা তার জোয়ান জামাই নিয়ে বাপের ভিটায়। এখন ঊষা আর ঊষার মা একইসাথে বুয়ার কাজ করে। আর ঊষার বাবা আর জামাই দু’জনে সেই পয়সায় শুরা খায়, ঘুরা খায়, ঘুমিয়ে দিন কাটায়।
কপাল বা মনুষ্য গোঁপালের ওপর ভর করে এরকম জীবন কাটানোর কথাও ভাবতে পারেন। ব্যপক সুখ।
ঘ. শরিয়াত: এই পথ একটু কঠিন এবং সফলতার হার আহামরি নয়। ওপরের তিনটাতে যদি ফেল মারেন কিংবা ওই পথে না যেতে চান, তাহলেই কেবল এই বন্ধুর পথে নামুন। তবে নিজ দায়ীত্বে, ফেল মারলে আমি দায়ী নই। তাছাড়া আবার বেশি ‘শরিয়াত বয়াতী’ বনে গেলে রাষ্ট্রের সহযোগীতায় মাইর খাবার সম্ভাবনাও থাকে। এই পথকে নিজের পথ করতে চাইলে নিয়মতান্ত্রীক হতে হবে। অতীতের রথি-মহারথিগণ যেভাবে যেই গুণ ও যোগ্যতা অর্জন করে, যেই শ্রম দিয়ে, যেই কীর্তি গড়ে সফল হয়েছেন, যেই পথ তারা বাতলে দিয়ে গেছেন, সেগুলো পড়ে, বুঝে, মেনে, করেই আপনাকে সফল হতে হবে। আর হবে তো হবে, আপনাকে ওই গুন ও যোগ্যতায় অতি অবশ্যই সুপার হতে হবে। হাফটিকিট বা সিকি হলে ভাত নেই। এই মাজহাব হয় হিরো অথবা জিরো, করো অথবা মরো, নাউ অর নেভার। এই পথ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। একটু ব্যাকডেটেডও বটে। জীবন ত্যানা ত্যানাও হয়ে যেতে পারে। এই মাজহাবের সফলতার হারও তত নয়। এই পথে সবাই রবার্ট ব্রুস হন না। তবে এই পথটায় চললে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আছে।
জীবন আপনার। পথ বেঁছে নেবার দায় ও অধিকারও আপনার। ভেবে, চিন্তে পথ বেঁছে নিন। বাঁছার সময় একটু হিসেবী, সতর্ক, চুজি ও স্বার্থপর হোন। এই পথ বাঁছার সময়টাতে কেবলমাত্র নিজের চয়েজ, ভবিষ্যত, বাস্তবতা ও সক্ষমতাকে বিবেচনায় নেবেন। আর কিছু না। বিশেষত ‘নৈতিকতা’ নামের ফালতু হাইমেনকে একদম পাত্তা দেবেন না।
বাংলাদেশে পেশাজীবি জগতে চলমান অর্থে কতরকম ক্যারিয়ার হতে পারে? কিছু ধরন আপনাদের বলি: –
১. চাকরি-হতে পারে, সেটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে। হতে পারে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে।
২. ব্যবসা-সেলফ এমপ্লয়মেন্টের এই ক্যারিয়ার বা ব্যবসা হতে পারে সরাসরি পণ্য উৎপাদন করে বিক্রীর, হতে পারে পণ্য কিনে তা বিক্রীর চিরাচরিত পন্থায় অথবা তার মধ্যস্ততা করার তথা ট্রেডারের, হতে পারে আমদানী-রপ্তানীর।
৩. সার্ভিস সেল করাও পেশা ও ক্যারিয়ার-যেমন আইনজীবি পেশা, ডাক্তারের পেশা, আর্কিটেক্ট, কবলার, হাউস মেইড, রিক্সা পুলার, ডে লেবারসহ কনসালট্যান্ট এর পেশা। যাকে অনেকটা সেলফ-এমপ্লয়মেন্টও বলা চলে। এঁরা আবার একই সেবা চাকরির ক্যারিয়ারের মধ্য দিয়েও দিতে পারেন।
৪. সেলফ এমপ্লয়মেন্টের অন্যতম পন্থা হল-ইনটেলেকচুয়াল ও ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট সেল করার ক্যারিয়ার। কেউ কেউ এটাকেও এক ধরনের ব্যবসা বলে থাকেন। যেমন ধরুন-আর্টিস্ট, পেশাদার গায়ক, নায়ক, নৃত্যশিল্পী, বক্তা, লেখক, খেলোয়াড়, ধর্মগুরু প্রমূখ।
৫. উৎপাদনকারী, কনভারটার অথবা ভ্যালু এ্যাডিশনার হিসেবে কাজ করাও হতে পারে খুব লাগসই ক্যারিয়ার। আপনি একজন কৃষক, খামারী, সফটওয়্যার নির্মাতা, সিনেমা নির্মাতা, প্রকাশক, পোষাক নির্মাতা, পিঠা বা ফাস্ট ফুড নির্মাতা।
৬. ’দালালী’ ও ‘মানি রোলিং’-জিনিস দুটোকে আপনি যেই চোখেই দেখে থাকুন না কেন, আধুনিক বিশ্বে এ দুটি খুবই প্রসারিত দুটি পেশা ও ক্যারিয়ার। ব্যবসা চ্যাপ্টারে অলরেডি তাদের কথা কিঞ্চিত বলেছি। মিডল ম্যান হিসেবে কাজ করা, হোক সেটা বড় বড় ডিলের, জমি বা গাড়ি বিক্রীর। বিশ্বে বিশাল বিশাল দালালী কোম্পানীই এখন আছে। ফুড পান্ডা কিংবা পাঠাওয়ের ব্যবসাটাকে আপনি কী বলবেন-যাদের নিজেদের কোনো পণ্য বা সেবা নেই?
অন্যের সেবাকে মধ্যস্ততা করে যাদের ব্যবসা চলে? ভাল কথা, ঈশ্বর ও পাপী বান্দাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে স্বর্গে যাবার টিকিট বিক্রেতা পীরসাব বা হিলিং ব্যবসায়ীদের ক্যারিয়ারও কিন্তু জমজমাট। এটাকে ঠিক ব্যবসা বলবেন, নাকি ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট সেল বলবেন জানি না।
সেই সাথে আছে টাকা দিয়ে টাকা বানানোর পেশা। যেমন-সুদে টাকা খাটানো (ব্যাংক বা সমবায়গুলো যা করে।) বা জমি লিজ দেয়া, বাসা ভাড়া দেয়া। ব্যক্তি পর্যায়েও বাংলাদেশে এই পেশা প্রচুর আছে। অনেকেই সেটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছে। শেয়ার বাজারে টাকা খাটানো আর সেটার দালালী বা ব্রোকারেজ-এই দুয়ে মিলে ‘হাওয়া দিয়ে টাকা বানানো’ও আজকাল একটি নতুন ধরনের ব্যবসায়ীক ক্যারিয়ার।
৭. চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারনা, লুট, ব্যাংকের টাকা লুট, পকেটমারী, সেক্স সার্ভিস-এগুলোও পেশা। তবে এগুলোকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেয়া চিরকালই ডেসট্রাকটিভ ক্যারিয়ার। আক্ষরিকভাবে বললে, এটাকে ৪ নম্বরে বর্ণিত ক্রিয়েটিভ ট্যালেন্ট বিক্রীর ক্যারিয়ার বলতে পারেন।
৮. রাজনীতি করাও এক প্রকার ক্যারিয়ার। বিশেষত বাংলাদেশে আপনি সিরিয়াসলী রাজনীতি করাকে পেশা তথা ক্যারিয়ার হিসেবে নেবার কথা ভাবতেই পারেন। আগের দিনে যেটা ওয়ারিয়র, কনকুয়ারার ও রাজা-বাদশাহীর ক্যারিয়ার বলা হত, সেটাই আজকাল রাজনীতি ক্যারিয়ার।
এর বাইরে আর দুই রকম ক্যারিয়ারের নাম না বললেই না।
তার একটা নাম হল ‘বাপের হোটেল’ বা ‘খোদার খাসি’ ক্যারিয়ার।
আর আরেকটা হল, আমার মতো ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র ক্যারিয়ার। প্রথমটায় আরাম আছে, কাম নাই।
দ্বিতীয় স্ট্রেইনটায় নাম আছে, দাম নাই। আরাম তো নাইই নাই।
সবশেষে বলুন তো, এস. এম. সুলতান, শাহ আবদুল করীম, লালন ফকির, জয়নুল আবেদীন, ফকির মজনু শাহ-এনাদের মতো যারা তাদের মেধা, দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতাকে বিনামূল্যে সৃষ্টি ও বিতরন করে গেছেন, তাদের দর্শন, জীবনপথ ও অবদানকে ঠিক কোন রকম ক্যারিয়ার বলা যাবে, তা আমারও জানা নেই। লক্ষ্য ঠিক করতে বলছি না। লক্ষ্য নির্ধারন করা শিখতে বলছি।
কীভাবে লক্ষ্য নির্বাচন করতে হবে-সেটি শিখুন, প্রয়োজনে একজন দক্ষ ও আন্তরিক মেনটরের কাছ থেকে জানুন। যেমন ধরুন, ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তির সময়ই ক্যারিয়ারের লক্ষ্য নির্ধারন করে নিতে হয়। সেটি যদি না নিয়ে থাকেন, তাহলে ক্যারিয়ার শুরুর সময় অন্তত বসুন ও সিদ্ধান্ত বানান।
৫ বছর ক্যারিয়ার হলে গেলে আবার বসুন। বিশ্লেষণ করুন, ঠিক পথে আছেন কিনা, পথ বদলানো দরকার কিনা, আর এরপর কী করতে চান। ক্যারিয়ার চয়েজ অনেক রকম-সরকারী বা বেসরকারী; কোন সেক্টর, কোন সেগমেন্ট, কোন স্টাটাস। অন্ধকার দিক নাকি আলোর-সেটাও ঠিক করে নেবেন। সেই সাথে তার পরিণতিও জেনে নেবেন।
যেমন ধরুন, যদি বিজনেসের কথা ভাবেন, তাহলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে লাগসই কারবার পদ্ধতি হল-
>ব্যাংক হতে টাকা নিন। একটা কিছুতে সামান্য অংশ ইনভেস্ট করুন, সেটিকে বছর দুয়েক পরে দেউলিয়া বানান। বাকিটা সিস্টেম করে দিন বেগমপাড়ায়। রাতারাতি বড়লোক। কোনো এক কাকডাকা ভোরে উড়োজাহাজে চড়ে বসুন। কাকপক্ষিও মাথা ঘামাবে না।
>নামকাওয়াস্তে একটা স্টার্টআপ নামের হাতি বানান। বেশি কাজ কাম বা উৎপাদন-বিক্রীতে যেতে হবে না। কেবল তুমুল প্রোমোশান ও ব্রান্ডিং চালান। TRP বাড়ুক। এইচআর ও স্ট্রাকচার তৈরীর কোনো দরকার নেই। পয়সা নষ্ট। তারপর একদিন বিরাট অংকের ইনভেস্টমেন্ট পান বা বাজারে শেয়ার ছেড়ে ফান্ড তিনগুন বানান। তারও পরে, একদিন ওই কোম্পানী আরও বড় কোনো জায়ান্টের কাছে বেঁচে দিন। ফক্কা।
>নানারকম প্রভাব ও লিংক কাজে লাগিয়ে দৈত্যাকার ডিল বাগান। ডিলের কাজ নিজেরা করবেন না। ডিল বাগানো হলে হা করে থাকা আরেক কুমিরের কাছে বেঁচে দিন, যারাই আসলে ওই কাজটা করবে। মাঝখান হতে ডিল বেঁচে আপনি লাল।
>টাকা দিয়ে টাকা বানানোর একটা নয়া পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। একজনের সাথে কথা হয়েছিল। বাচ্চা ছেলে। এর মধ্যেই টাকা দিয়ে টাকা বানানো শিখে গেছে এবং চ্যানেলও পেয়ে গেছে। ওটাও করতে পারেন।
>একদম কিছু না পারলে আজই ড্রপ আউট বা পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে হয় মাস্তান না হয় রাজনীতিক বনে যান। জীবন ধন্য হয়ে যাবে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়্যীদ সাহেবের একটা কথা আমার খুব প্রিয়। জাগতিক অপ্রাপ্তি নিয়ে যখনি কোনো ফ্রাস্ট্রেশান আসে তখুনি কথাটা জপ করি। “আমরা সবাই সফলতার পিছনে ছুটি। কিন্তু জীবনে সফলতা নয়, স্বার্থকতার পেছনে ছোটা উচিৎ।”
সত্যিই জীবনটা কতটুকু স্বার্থক হল সেটাই ভাবনার বিষয়। এটাকে কতটা অর্থবহ কাজে লাগাতে পারলাম? ক্যারিয়ার কথাটিকে দুইভাবে নেয়া যায়-আর্থিক প্রাপ্তি ও আত্মিক প্রাপ্তি।
শুধুমাত্র পদ ও অর্থ-দুয়ের বৃদ্ধি ক্যারিয়ার নয়। আমার প্রতি বছরের অভিজ্ঞতা আমাকে কতটা সমৃদ্ধ মানুষে পরিনত করেছে সেটাও অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
আর মনে রাখা দরকার-টিকিয়া থাকাই চরম স্বার্থকতা নহে। অতিকায় হাতি/ডাইনোসর লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা আজও টিকিয়া আছে। ইহাতে তেলাপোকার কিছুমাত্র মর্যাদাবৃদ্ধি হয় নাই”। ইহাকে মহান বানী ভাবিবার কোনো দরকার নাই।
আমি নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে তাক করিয়া কথাগুলি আপনাদের বলিয়াছি। যে যাহার মতো তর্জমা করিয়া নিন।
আমরা কার জন্য কিসের জন্য কাজ করি? পয়সা? প্রিয়জন? পরিবার? আত্মসম্মান? আনন্দের জন্য কাজ করি ক’জন? কর্মক্ষেত্রে আনন্দ সৃষ্টিতে আমরা কতটা পারঙ্গম? আমরা আদৌ কতটা আগ্রহী।
প্রফেশনাল অফিস ম্যানেজমেন্টে একটা কথা দীর্ঘদিন যাবৎ বলা হচ্ছে-কর্মক্ষেত্রে পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পেশাদার কর্মপ্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের দেশে সরকারী প্রতিষ্ঠানে একধরনের আমলাতন্ত্রকে পেশাদারিত্ব বলে চালিয়ে দেয়া হয়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পেশাদ্বারিত্ব কতটা?
আমার নিজস্ব ব্যখ্যায় প্রাইভেট লিমিটেড ও পাবলিক লিমিটেড-এই দু’ধরনের প্রতষ্ঠান যা তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন তার বাইরে আরও একধরনের প্রতিষ্ঠান আছে।
আমার মনে হয় বেশিরভাগ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে পড়ে যেতে পারে আর তা হল-পার্সনাল লিমিটেড কোম্পানী-চাকরিজীবি আছে, পেশাদার নেই, পেশাদারিত্ব নেই।
ধারালো সামুরাই দিয়ে রোজ মাটি কাটলে সেটাও দুইদিন না হোক, ১০ দিনের পর ভোতা হয়ে যায়। স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠানে কাজ না করলে ঝানু কর্মীরও ইফিশিয়েন্সি দিনে দিনে কমে যায়। তাই নিজের যোগ্যতার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতাও যাচাই করে কাজ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কর্পোরেট আপনাকে এমন একটি লোভনীয় মূলা (মানে মাইনে ও অন্যান্য আর কি) দেবে, যেটা দিয়ে আপনি তৃপ্ত স্ত্রী, বন্ধুমহল, আড্ডা, বিদেশ গমন, একটি চার চাকার যন্ত্রশকট, ছো্ট্ট মুরগীর খোপ-এসব নিয়ে সমাজের দশজনের একজন হয়ে নিজেকে হৃষ্ট পুরুষ হিসেবে সুখী করতে থাকবেন। শান্তি না থাকলেও, সেখানে সুখ আছে। এই আরামের লোভ ছাড়বার মতো সাহস আপনার হবে না। আবার কর্পোরেট আপনাকে এতটা বেশিও দেবে না, যা থেকে মোটা একটি অংশ বাঁচিয়ে অচীরেই আপনি কর্পোরেটকে যেকোনো সময় বিদায় বলার মতো ঘাড় মোটা করতে পারবেন। ফলাফল? কর্পোরেট সুখের চোরাবালিতে আজীবন ”দিন যায় কথা থাকে।” অথবা, রেখো মা দাসেরে মনে।
সিনিয়রিটি মানে শুধু বয়স নয়, শুধু চাকুরিতে দীর্ঘকাল নয়, আপার পজিশন নয়। কে কতটা লোড নিচ্ছি, কতটা আস্থা তৈরী করতে পেরেছি সেটাও বিবেচ্য। যার যার পজিশন অনুযায়ি কাজ ো লোড নেয়া উচিৎ। অবস্থা এমন যে সিনিয়রেরটা জুনিয়র আর জুনিয়রেরটা সিনিয়র করল। আর আমাদের স্বভাবই হল প্রোজেকশনের কাজ টেনে নেয়া আর গঠনমুলক কাজ যেগুলোতে পয়েন্ট কম শ্রম বেশি সেগুলো থেকে পাশ কাটিয়ে চলা।
আমা কোনো সাধু উপদেশ দিচ্ছি না। বাস্তবতা বলছি। পেশাগত জীবন একটা ম্যারাথন এর মতো যেখানে ট্রাক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। থামার কোনো সুযোগ নেই। আমি যদি থামি তবে অন্য কেউ মুহুতে আমাকে পেছনে ফেলে দেবে। পেশাগত জীবনে কাজের বা এক্সপোজার দেখানোর সুযোগ হল গাছ থেকে পাকা আম পড়ার মতো।
আমি যদি সেটাকে কুড়িয়ে না নেই তবে মুহুর্তের মধ্যে সেটা অন্য কেউ নিয়ে নেবে। যার যার পজিশনের ও পদের লেভেলের প্রতি যদি সুবিচার না করে থাকি তবে নিচের লোকেরা শুন্য যায়গা নিয়ে নেবে-এটাই খুব স্বাভাবিক। বার্তাটি সাধারন তবে অনেক কিছুর ইঙ্গিতবাহী।
#definitionofcareer #difiningcareer #whatiscareer #TypeOfCareer #survival #whatissuccess #definitionofsuccess #moneymaking #buyinghappiness #careerism #sharpness #professionalism #practice