Skip to content

একজন পেশাজীবির চোখে আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা গার্মেন্টস শিল্পের দিকে ধেয়ে আসা গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ: আমরা কতটা প্রস্তুত

  • by

যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চমক কিংবা মিরাকল কী ছিল—আমি কয়েকটা নাম বলব: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশ্বপরিচিতি, শাহবাগ আন্দোলন নামক একটি বিরল শহুরে মধ্যবিত্ত গণজোয়ার, বাংলাদেশের একজন মানুষের নোবেল জয়, বাংলাদেশী হিসেবে কারো এভারেস্ট জয়, এককালের তলাহীন ঝুড়ির অধুনা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট দেবার দুঃসাহস, পদ্মা সেতুর মতো একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ দেবার দাপট।

আরেকটা মিরাকল আছে—গার্মেন্টস নামক একটি বিস্ময়। কী, চোখ কুঁচকে ফেললেন? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন লেখাটা আর পড়ে সময় নষ্ট করবেন না? যদি তা করেন তবে আরেকটু কষ্ট করে পড়ুন। হ্যাঁ, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের বিগত চার দশক ধরে সর্ববৃহৎ বিস্ময় বলে আমি বিশ্বাস করি। যেহেতু গার্মেন্টসের গুণগান আজকে আমার মূল উদ্দেশ্য নয়, তাই আমি লেখাটি সংক্ষিপ্ত রাখতে এর পক্ষে মাত্র পাঁচটি যুক্তি দেব:

১) যে প্রায় ৫০ লক্ষ (ডাইরেক্ট) কর্মী এখানে কাজ করেন—তারা গার্মেন্টস না থাকলে কোথায় কাজ পেতেন? ভাবুন তো, দেশে এখন সরাসরি বেকার ২৬ লক্ষ। এই ৫০ লক্ষ তার সাথে যোগ হয়ে এটি ৭৬ লাখ হত।
২) পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ১ কোটি মানুষ গার্মেন্টস রিলেটেড ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজে কাজ করেন। তাদের ও ডিরেক্ট কর্মীদের জিডিপিতে মোট আর্থিক অবদান কত—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) এর মধ্যে যে ৮০% মেয়ে শ্রমিক আছেন, গার্মেন্টস না থাকলে তাদের আজকের অবস্থান কী হত?
৪) বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮২% (২৮ বিলিয়ন ডলার) দখল করেছে গার্মেন্টস শিল্প। এটা না থাকলে আমরা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দেবার সাহস কোথা থেকে পেতাম?
৫) ক্রিকেট ছাড়া আরেকটি জিনিস যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেটা হলো গার্মেন্টসের “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডিং।

আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য অন্য। বাংলাদেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেননের ভবিষ্যত—অতিশীঘ্রই যেসব ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই খাতটি—তার একটি নন-একাডেমিক স্টাডি (অধ্যয়ন) আমার উদ্দেশ্য। খুব সরলভাবে, এই খাতের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে নির্মোহ কিন্তু বাস্তববাদী বিশ্লেষণই আমি দিতে চাই। অনেকে বলতে পারেন, “চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই”। হ্যাঁ, থাকে; তবে যদি কোনো দেশের রপ্তানির ৮২% এক মাত্র খাত দখল করে এবং সেই খাতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ (প্রত্যক্ষভাবে) রুজি রুটির জন্য নিয়োজিত থাকে, তাহলে সেই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব অন্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি চিন্তার বিষয়।

যদি লেখাটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা-গণ, কিংবা উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখা মানুষজন, কিংবা যারা এই সেক্টরের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মী—তারা পড়েন এবং আমাদের রক্ত-ঝরানো এই শিল্পটিকে বাঁচাতে, টিকিয়ে রাখতে এবং এগিয়ে নিতে এই লেখাটি কাজে আসে; তবে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে। তবে অনেকে বলতে পারেন, “আপনি উদ্যোক্তা বা নীতিনির্ধাবককে এত জ্ঞান দিয়ে কী করছেন—নিজে কেন উদ্যোক্তা হন না?” ভাই, উদ্যোক্তা হবার জন্য যতগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে হয়, তার মধ্যে এই জ্ঞানটুকু একমাত্র যথেষ্ট নয়। আরো অনেকগুলো বিষয় দরকার; তার মধ্যে অন্যতম হলো “ডিটারমিনেশন”—উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিক দৃঢ়তা—যেটা আমার নেই। তাই উদ্যোক্তা হওয়া সবসময় হয় না। আমি আমার দীর্ঘ ১২ বছরের চোখে দেখা গার্মেন্টসের নানান চড়াই-উতরাই এবং গার্মেন্টসের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান বিশ্বের ও আমাদের দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে এই প্রাণভোমরা শিল্পটির সামনে শীঘ্রই যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, তাদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে চাই।

প্রথম প্রধান চ্যালেঞ্জ—ব্রেক ইভেন অব ইন্ডাস্ট্রি: আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী মিলিয়ন ডলারের বাজেট আজ ইতিমধ্যেই ৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একবার যেহেতু ৪ লক্ষ কোটি হয়ে গেছে, সেটা ইকোনোমির নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ী আর ৩ লক্ষ হবার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটা ক্রমাগত বড় হওয়াই থাকবে। এই ভলিউমের অর্থনীতির একটি অবস্থা হল—একসময় তার প্রধান খাতগুলো ব্রেক-ইভেনে চলে যায়; অর্থাৎ ওই দেশের অর্থনীতির প্রধান খাতগুলো তাদের একক অবদানের দিক দিয়ে ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে চলে আসে। তারপর আর ওই খাত নির্ভর করে অর্থনীতি চালানো যাবে না। ইকোনমিকে তার গতিধারা বজায় রাখতে আরো বেশি স্ফটিস্টিকেটেড (sophisticated) খাত, সুপার ভ্যালু খাতে মাইগ্রেট করতে হয়। অর্থাৎ একটি পর্যায়ে আমাদের বর্তমান প্রধান খাতকে পিছনে ফেলে নতুন, অধিকতর উপযুক্ত খাত খুঁজে নিতে হবে—এই রকম বদল অত্যন্ত জরুরি। ভুলে যাবেন না—জাপান, ইউএসএ, কোরিয়াও একসময় গার্মেন্টস করত; তারা আজ সেখানে নেই যেখানে তারা ৪০ বছর আগে ছিল। (এর ওপর আরো তথ্যের জন্য ১৪ জুনের প্রথম আলোতে বদিউল আলম মজুমদারের কলামও দেখুন।)

দ্বিতীয়ত—ইউরোপে জনসংখ্যা হ্রাস: শুনলে হয়তো হাসি আসবে, তবে ইউরোপ (যা আমাদের গারমেন্টস রপ্তানীর প্রধান হাব) তাদের জনসংখ্যার ক্রমহ্রাস আমাদের জন্য ধীর কিন্তু স্থায়ী ঝুঁকি। মানুষ কমলে কনজাম্পশন কমবে; ফলে অর্ডার ফ্লো কমে যাবে। কেউ বলবেন, “মাইগ্র্যান্টরা গ্যাপ পূরণ করছে।” কিন্তু তারা সাধারণত আমাদের ২৫ ডলারের শার্ট-প্যান্ট কেনার সক্ষমতা তাদের কাছে থাকে না।

তৃতীয়ত—মজুরীর আপেক্ষিক বৃদ্ধি: গার্মেন্টস খাতের প্রতিযোগিতাদক্ষতার অন্যতম প্রধান চালক আমাদের তুলনামূলক কম শ্রমমূল্য। আমি বলছি “কম নয়”, বরং “আপেক্ষিকভাবে কম” — তা যতদিন থাকে ততদিন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা থাকবে। কিন্তু মজুরি বাড়তে বাড়তে যদি ব্রেক-ইভেনের ওপরে চলে যায়, আমাদের প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা কমতে শুরু করবে। (এখানে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত কি না—এটি আলাদা বিতর্ক। আমি কেবল মজুরি বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট ইমপ্যাক্ট বোঝাতে চাইছি।)

চতুর্থত—একর্ড ও এলায়েন্সের জন্ম: বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের জন্য ভালো কিছু দিয়েছে, কিন্তু একই সাথে অনেক অভিশাপের দরজা খুলে দিয়েছে। ঐ দুই বেনিয়া জোট (Accord ও Alliance) আমাদের খাতকে দাবি করেছে যে শ্রমপরিবেশ সংশোধন জরুরি—এর ফলে প্রায় ২৫০টি চালু কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক কারখানার জন্য ১০–১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রয়োজন হবে পরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নে। এই ব্যয়ের যোগান ও রিটার্ন পাওয়ার চ্যালেঞ্জ ভয়াবহ।

পঞ্চমত—অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণবিহীন কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি: অতিরিক্ত ইউনিট জন্মালে দেশটির ভিতরে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে—বায়াররা লাভবান হবে, কিন্তু বাংলাদেশ নয়। অর্ডার ভাগ হয়ে যাবে; ফলে আমাদের লাভের অংশে চাপ পড়বে।

ষষ্ঠত—বায়ারদের চাপের ফলে পোশাকের গ্রস মূল্য কমে যাওয়া: বায়াররা ক্রমাগত দাম কমানোর চাপে রাখে। একটি উদাহরণ দিলাম—ধরা যাক বার্ষিক টার্নওভার ১০০ টাকা হলে ৬৫ টাকা কাঁচামালের জন্য বিদেশী সাপ্লায়ারকে দিতে হয়; বাকি ৩৫ টাকাই বাকি খরচ মেটাতে হয়—বেতন, বোনাস, অপচয়, এমনকি টয়লেট পেপার ইত্যাদি। গার্মেন্টস ব্যবসায় প্রতিটি স্টিচ বা সুঁইয়ের হিসাব করে পয়সা আয় করা হয়—এটাই বাস্তবতা।

সপ্তমত—ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজের ঘাটতি: গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি যে পরিসরে বেড়েছে, সেই বর্ধিত ভলিউমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাকওয়ার্ড (কাঁচামাল, জার্নাল) ও ফরওয়ার্ড (লজিস্টিক, ব্র্যান্ডিং) লিংকেজ বেড়েছে না। ফলে আমরা বিদেশি সাপ্লায়ারদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি—এই নির্ভরতা লিড-টাইম বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতায় চিনের মতো দেশের সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন করে তোলে।

অষ্টমত—শিক্ষা বৃদ্ধির প্রভাব: দেশের শিক্ষার হার বাড়লে গার্মেন্টস খাতে রিলেটিভভাবে লোকসংখ্যা কমবে, কারণ বেশি শিক্ষিত নারীরা গার্মেন্টসে কাজ করতে আগ্রহী হবে না। সরকারের স্টাইপেন্ড/সাবসিডি দিলে মেয়েদের গার্মেন্টসে আসা কমবে—এখনই ১০–১৫ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি আছে; শিক্ষার হার বাড়ালে ঘাটতি আরো বাড়বে।

নবমত—অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি গার্মেন্টসের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া: দেশের মানুষের আয় বাড়লেই অনেকেই গার্মেন্টসের নীচু-প্রতিষ্ঠিত কাজ এড়িয়ে যাবে; ফলে শ্রমিক সরবরাহ সংকোচ হবে। উদাহরণ—যদি দেশের পার-হেড ইনকাম অনেক বাড়ে, মানুষ গার্মেন্টসে কাজ করতে চাইবে না। আর এর ফলে দক্ষ শ্রমশক্তি হারাবে।

দশমত—ইমেজ সংকট: একজন গার্মেন্টস মালিক বলছেন—দেশে নানা “বিশেষজ্ঞ” বা চিত্তবিকার গ্রুপ গার্মেন্টস শিল্পকে ক্রমাগত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে; এতে করে অর্ডার শিফটিং হয় এবং প্রতিযোগী দেশগুলো লাভবান হয়। রানা প্লাজা বা অনুরূপ কাণ্ডের পরেও এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা আমাদের ক্ষতি করেছে।

এবার—গার্মেন্টস সেক্টরের তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ যদি আমাকে বলতে বলা হয়, আমি বলব মানবসম্পদের ঘাটতি সেগুলোর এক। শ্রমিকের ঘাটতি আছে, পাশাপাশি যোগ্য, দক্ষ, স্মার্ট, ভিশনারি কারিগরি ও ম্যানেজমেন্ট কর্মীর ঘাটতিও আছে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানী লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে যে পরিমাণ হার্ড-ক্যারিবার ম্যানপাওয়ার দরকার তা আমাদের নেই এবং তৈরির কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থাও এখনো নাই। তাহলে কারা নেতৃত্ব দেবে এই ম্যান্ডেটরি গ্রোথ-কে?

আরেকটি বিষয়—মার্জিনাল গ্রোথ রেট: প্রতিটি খাত টিকে থাকতে ধারাবাহিক মার্জিনাল গ্রোথ রেট ধরে রাখতে হয়। আমাদের বিজনেস ডেটা বলছে, গত পাঁচ বছরে এই খাতের মার্জিনাল গ্রোথ রেট হ্রাস পাচ্ছে; আগে যা ৬–৭% ছিল, সেটা ২০১৭-এ মাইনাসে গেছে—যা ভয়াবহ।

১৩তম পয়েন্টে (যা বলে দুঃখ পেতে পারেন কিছু দল) বলছি—ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএসএ ক্রমাগতভাবে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দিচ্ছে; ট্রেড ইউনিয়ন ইস্যুতে (আরও কিছু ইস্যুর সঙ্গে) জিএসপি সুবিধা স্থগিত আছে; ইইউও সেই পথে যাচ্ছে। জিএসপি না থাকলে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে; আর ইউনিয়ন দিলে যদি আমরা প্রস্তুত না থাকি, সেটাই খাতকে মারবে। আমাদের ম্যানচিস্ট্রিকেটেড, ম্যাচিওরড ট্রেড ইউনিয়ন নেই; আগে খাতটিকে বাঁচাতে হবে, পরে ফাইন-টিউনিং চিন্তা করা যাবে।

এই ১৩টি বলে আমি অগণিত আরও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরতে পারি। তবে সংক্ষেপে বলি—এই সব চ্যালেঞ্জ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মোকাবেলা করা আরো বেশি জটিল ও চাপযুক্ত। প্রশ্ন হলো—এগুলো আমরা কিভাবে মোকাবেলা করব? প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে থ্রেটগুলো আসছে এবং কামড়ে মারবে; তাহলেই আমরা সিরিয়াসলি মোকাবিলা শুরু করতে পারব।

আমি বড়-গুরু একাডেমিশিয়ান নই, তাই সিদ্ধান্তমূলক সমাধানগুলো হয়তো থিওরেটিক্যালভাবে গোছানোভাবে বলতে পারব না। তবু সংক্ষেপে বলছি—বাংলাদেশী গার্মেন্টস খাতকে সবদিক থেকেই তৈরি হতে হবে; বিশ্বের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হতে হবে। আমাদের অপটিমাম ব্যবহার করতে হবে বিদ্যমান রিসোর্স; এনার্জি, অর্থ, সময় এবং অপর্চুনিটি ওয়েস্টেজ কমাতে হবে। মানবসম্পদ ঘাটতি পুরন করতে হবে—উভয় দিকেই: লেবার ও ম্যানেজমেন্ট। গার্মেন্টস সেক্টর লেবার-ইনটেনসিভ; খাতের উন্নতির মূলটি ম্যানপাওয়ারের সক্ষমতা বাড়াতেই।

একটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে অনেক কিছু করতে পারবে—প্রথম ধাপে বিপদের আগেই সেটা রিয়েলাইজ করা, বিপদের ধরন ও কারণ বোঝা, ইন্টেলেকচুয়াল ও টেকনিক্যাল ম্যানপাওয়ারকে সিঙ্ক্রোনাইজ করা, প্রো-অ্যাকটিভ ব্যবস্থা নেয়া, ওয়েস্টেজ স্টপ করা এবং নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করা—এইগুলো জরুরি। আমি বলব—অত্যন্ত স্মার্ট, হাই-কোয়ালিফায়েড এবং প্রফেশনাল কর্মী হায়ার করুন; এ্যামেচার দিয়ে গার্মেন্টস আর চলবে না। সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট—এই নীতি মেনে চলতে হবে।

আর এক ব্যক্তিগত বিশ্বাস (যা হয়তো অবৈজ্ঞানিক শোনাবে): বাংলাদেশের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো—এক; গার্মেন্টস সেক্টর ও এর যোদ্ধাদের লড়াকু স্বকীয়তা ও অতীত সাফল্য; দুই; বাঙালী কখনও কারো কাছে নত হয়নি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মন্ত্র।

যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চমক কিংবা মিরাকল কী ছিল—আমি কয়েকটা নাম বলব: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশ্বপরিচিতি, শাহবাগ আন্দোলন নামক একটি বিরল শহুরে মধ্যবিত্ত গণজোয়ার, বাংলাদেশের একজন মানুষের নোবেল জয়, বাংলাদেশী হিসেবে কারো এভারেস্ট জয়, এককালের তলাহীন ঝুড়ির অধুনা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট দেবার দুঃসাহস, পদ্মা সেতুর মতো একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ দেবার দাপট।

আরেকটা মিরাকল আছে—গার্মেন্টস নামক একটি বিস্ময়। কী, চোখ কুঁচকে ফেললেন? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন লেখাটা আর পড়ে সময় নষ্ট করবেন না? যদি তা করেন তবে আরেকটু কষ্ট করে পড়ুন। হ্যাঁ, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের বিগত চার দশক ধরে সর্ববৃহৎ বিস্ময় বলে আমি বিশ্বাস করি। যেহেতু গার্মেন্টসের গুণগান আজকে আমার মূল উদ্দেশ্য নয়, তাই আমি লেখাটি সংক্ষিপ্ত রাখতে এর পক্ষে মাত্র পাঁচটি যুক্তি দেব:

১) যে প্রায় ৫০ লক্ষ (ডাইরেক্ট) কর্মী এখানে কাজ করেন—তারা গার্মেন্টস না থাকলে কোথায় কাজ পেতেন? ভাবুন তো, দেশে এখন সরাসরি বেকার ২৬ লক্ষ। এই ৫০ লক্ষ তার সাথে যোগ হয়ে এটি ৭৬ লাখ হত।
২) পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ১ কোটি মানুষ গার্মেন্টস রিলেটেড ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজে কাজ করেন। তাদের ও ডিরেক্ট কর্মীদের জিডিপিতে মোট আর্থিক অবদান কত—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) এর মধ্যে যে ৮০% মেয়ে শ্রমিক আছেন, গার্মেন্টস না থাকলে তাদের আজকের অবস্থান কী হত?
৪) বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮২% (২৮ বিলিয়ন ডলার) দখল করেছে গার্মেন্টস শিল্প। এটা না থাকলে আমরা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দেবার সাহস কোথা থেকে পেতাম?
৫) ক্রিকেট ছাড়া আরেকটি জিনিস যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেটা হলো গার্মেন্টসের “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডিং।

আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য অন্য। বাংলাদেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেননের ভবিষ্যত—অতিশীঘ্রই যেসব ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই খাতটি—তার একটি নন-একাডেমিক স্টাডি (অধ্যয়ন) আমার উদ্দেশ্য। খুব সরলভাবে, এই খাতের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে নির্মোহ কিন্তু বাস্তববাদী বিশ্লেষণই আমি দিতে চাই। অনেকে বলতে পারেন, “চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই”। হ্যাঁ, থাকে; তবে যদি কোনো দেশের রপ্তানির ৮২% এক মাত্র খাত দখল করে এবং সেই খাতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ (প্রত্যক্ষভাবে) রুজি রুটির জন্য নিয়োজিত থাকে, তাহলে সেই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব অন্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি চিন্তার বিষয়।

যদি লেখাটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা-গণ, কিংবা উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখা মানুষজন, কিংবা যারা এই সেক্টরের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মী—তারা পড়েন এবং আমাদের রক্ত-ঝরানো এই শিল্পটিকে বাঁচাতে, টিকিয়ে রাখতে এবং এগিয়ে নিতে এই লেখাটি কাজে আসে; তবে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে। তবে অনেকে বলতে পারেন, “আপনি উদ্যোক্তা বা নীতিনির্ধাবককে এত জ্ঞান দিয়ে কী করছেন—নিজে কেন উদ্যোক্তা হন না?” ভাই, উদ্যোক্তা হবার জন্য যতগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে হয়, তার মধ্যে এই জ্ঞানটুকু একমাত্র যথেষ্ট নয়। আরো অনেকগুলো বিষয় দরকার; তার মধ্যে অন্যতম হলো “ডিটারমিনেশন”—উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিক দৃঢ়তা—যেটা আমার নেই। তাই উদ্যোক্তা হওয়া সবসময় হয় না। আমি আমার দীর্ঘ ১২ বছরের চোখে দেখা গার্মেন্টসের নানান চড়াই-উতরাই এবং গার্মেন্টসের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান বিশ্বের ও আমাদের দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে এই প্রাণভোমরা শিল্পটির সামনে শীঘ্রই যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, তাদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে চাই।

প্রথম প্রধান চ্যালেঞ্জ—ব্রেক ইভেন অব ইন্ডাস্ট্রি: আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী মিলিয়ন ডলারের বাজেট আজ ইতিমধ্যেই ৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একবার যেহেতু ৪ লক্ষ কোটি হয়ে গেছে, সেটা ইকোনোমির নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ী আর ৩ লক্ষ হবার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটা ক্রমাগত বড় হওয়াই থাকবে। এই ভলিউমের অর্থনীতির একটি অবস্থা হল—একসময় তার প্রধান খাতগুলো ব্রেক-ইভেনে চলে যায়; অর্থাৎ ওই দেশের অর্থনীতির প্রধান খাতগুলো তাদের একক অবদানের দিক দিয়ে ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে চলে আসে। তারপর আর ওই খাত নির্ভর করে অর্থনীতি চালানো যাবে না। ইকোনমিকে তার গতিধারা বজায় রাখতে আরো বেশি স্ফটিস্টিকেটেড (sophisticated) খাত, সুপার ভ্যালু খাতে মাইগ্রেট করতে হয়। অর্থাৎ একটি পর্যায়ে আমাদের বর্তমান প্রধান খাতকে পিছনে ফেলে নতুন, অধিকতর উপযুক্ত খাত খুঁজে নিতে হবে—এই রকম বদল অত্যন্ত জরুরি। ভুলে যাবেন না—জাপান, ইউএসএ, কোরিয়াও একসময় গার্মেন্টস করত; তারা আজ সেখানে নেই যেখানে তারা ৪০ বছর আগে ছিল। (এর ওপর আরো তথ্যের জন্য ১৪ জুনের প্রথম আলোতে বদিউল আলম মজুমদারের কলামও দেখুন।)

দ্বিতীয়ত—ইউরোপে জনসংখ্যা হ্রাস: শুনলে হয়তো হাসি আসবে, তবে ইউরোপ (যা আমাদের গারমেন্টস রপ্তানীর প্রধান হাব) তাদের জনসংখ্যার ক্রমহ্রাস আমাদের জন্য ধীর কিন্তু স্থায়ী ঝুঁকি। মানুষ কমলে কনজাম্পশন কমবে; ফলে অর্ডার ফ্লো কমে যাবে। কেউ বলবেন, “মাইগ্র্যান্টরা গ্যাপ পূরণ করছে।” কিন্তু তারা সাধারণত আমাদের ২৫ ডলারের শার্ট-প্যান্ট কেনার সক্ষমতা তাদের কাছে থাকে না।

তৃতীয়ত—মজুরীর আপেক্ষিক বৃদ্ধি: গার্মেন্টস খাতের প্রতিযোগিতাদক্ষতার অন্যতম প্রধান চালক আমাদের তুলনামূলক কম শ্রমমূল্য। আমি বলছি “কম নয়”, বরং “আপেক্ষিকভাবে কম” — তা যতদিন থাকে ততদিন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা থাকবে। কিন্তু মজুরি বাড়তে বাড়তে যদি ব্রেক-ইভেনের ওপরে চলে যায়, আমাদের প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা কমতে শুরু করবে। (এখানে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত কি না—এটি আলাদা বিতর্ক। আমি কেবল মজুরি বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট ইমপ্যাক্ট বোঝাতে চাইছি।)

চতুর্থত—একর্ড ও এলায়েন্সের জন্ম: বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের জন্য ভালো কিছু দিয়েছে, কিন্তু একই সাথে অনেক অভিশাপের দরজা খুলে দিয়েছে। ঐ দুই বেনিয়া জোট (Accord ও Alliance) আমাদের খাতকে দাবি করেছে যে শ্রমপরিবেশ সংশোধন জরুরি—এর ফলে প্রায় ২৫০টি চালু কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক কারখানার জন্য ১০–১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রয়োজন হবে পরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নে। এই ব্যয়ের যোগান ও রিটার্ন পাওয়ার চ্যালেঞ্জ ভয়াবহ।

পঞ্চমত—অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণবিহীন কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি: অতিরিক্ত ইউনিট জন্মালে দেশটির ভিতরে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে—বায়াররা লাভবান হবে, কিন্তু বাংলাদেশ নয়। অর্ডার ভাগ হয়ে যাবে; ফলে আমাদের লাভের অংশে চাপ পড়বে।

ষষ্ঠত—বায়ারদের চাপের ফলে পোশাকের গ্রস মূল্য কমে যাওয়া: বায়াররা ক্রমাগত দাম কমানোর চাপে রাখে। একটি উদাহরণ দিলাম—ধরা যাক বার্ষিক টার্নওভার ১০০ টাকা হলে ৬৫ টাকা কাঁচামালের জন্য বিদেশী সাপ্লায়ারকে দিতে হয়; বাকি ৩৫ টাকাই বাকি খরচ মেটাতে হয়—বেতন, বোনাস, অপচয়, এমনকি টয়লেট পেপার ইত্যাদি। গার্মেন্টস ব্যবসায় প্রতিটি স্টিচ বা সুঁইয়ের হিসাব করে পয়সা আয় করা হয়—এটাই বাস্তবতা।

সপ্তমত—ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজের ঘাটতি: গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি যে পরিসরে বেড়েছে, সেই বর্ধিত ভলিউমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাকওয়ার্ড (কাঁচামাল, জার্নাল) ও ফরওয়ার্ড (লজিস্টিক, ব্র্যান্ডিং) লিংকেজ বেড়েছে না। ফলে আমরা বিদেশি সাপ্লায়ারদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি—এই নির্ভরতা লিড-টাইম বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতায় চিনের মতো দেশের সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন করে তোলে।

অষ্টমত—শিক্ষা বৃদ্ধির প্রভাব: দেশের শিক্ষার হার বাড়লে গার্মেন্টস খাতে রিলেটিভভাবে লোকসংখ্যা কমবে, কারণ বেশি শিক্ষিত নারীরা গার্মেন্টসে কাজ করতে আগ্রহী হবে না। সরকারের স্টাইপেন্ড/সাবসিডি দিলে মেয়েদের গার্মেন্টসে আসা কমবে—এখনই ১০–১৫ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি আছে; শিক্ষার হার বাড়ালে ঘাটতি আরো বাড়বে।

নবমত—অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি গার্মেন্টসের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া: দেশের মানুষের আয় বাড়লেই অনেকেই গার্মেন্টসের নীচু-প্রতিষ্ঠিত কাজ এড়িয়ে যাবে; ফলে শ্রমিক সরবরাহ সংকোচ হবে। উদাহরণ—যদি দেশের পার-হেড ইনকাম অনেক বাড়ে, মানুষ গার্মেন্টসে কাজ করতে চাইবে না। আর এর ফলে দক্ষ শ্রমশক্তি হারাবে।

দশমত—ইমেজ সংকট: একজন গার্মেন্টস মালিক বলছেন—দেশে নানা “বিশেষজ্ঞ” বা চিত্তবিকার গ্রুপ গার্মেন্টস শিল্পকে ক্রমাগত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে; এতে করে অর্ডার শিফটিং হয় এবং প্রতিযোগী দেশগুলো লাভবান হয়। রানা প্লাজা বা অনুরূপ কাণ্ডের পরেও এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা আমাদের ক্ষতি করেছে।

এবার—গার্মেন্টস সেক্টরের তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ যদি আমাকে বলতে বলা হয়, আমি বলব মানবসম্পদের ঘাটতি সেগুলোর এক। শ্রমিকের ঘাটতি আছে, পাশাপাশি যোগ্য, দক্ষ, স্মার্ট, ভিশনারি কারিগরি ও ম্যানেজমেন্ট কর্মীর ঘাটতিও আছে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানী লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে যে পরিমাণ হার্ড-ক্যারিবার ম্যানপাওয়ার দরকার তা আমাদের নেই এবং তৈরির কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থাও এখনো নাই। তাহলে কারা নেতৃত্ব দেবে এই ম্যান্ডেটরি গ্রোথ-কে?

আরেকটি বিষয়—মার্জিনাল গ্রোথ রেট: প্রতিটি খাত টিকে থাকতে ধারাবাহিক মার্জিনাল গ্রোথ রেট ধরে রাখতে হয়। আমাদের বিজনেস ডেটা বলছে, গত পাঁচ বছরে এই খাতের মার্জিনাল গ্রোথ রেট হ্রাস পাচ্ছে; আগে যা ৬–৭% ছিল, সেটা ২০১৭-এ মাইনাসে গেছে—যা ভয়াবহ।

১৩তম পয়েন্টে (যা বলে দুঃখ পেতে পারেন কিছু দল) বলছি—ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএসএ ক্রমাগতভাবে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দিচ্ছে; ট্রেড ইউনিয়ন ইস্যুতে (আরও কিছু ইস্যুর সঙ্গে) জিএসপি সুবিধা স্থগিত আছে; ইইউও সেই পথে যাচ্ছে। জিএসপি না থাকলে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে; আর ইউনিয়ন দিলে যদি আমরা প্রস্তুত না থাকি, সেটাই খাতকে মারবে। আমাদের ম্যানচিস্ট্রিকেটেড, ম্যাচিওরড ট্রেড ইউনিয়ন নেই; আগে খাতটিকে বাঁচাতে হবে, পরে ফাইন-টিউনিং চিন্তা করা যাবে।

এই ১৩টি বলে আমি অগণিত আরও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরতে পারি। তবে সংক্ষেপে বলি—এই সব চ্যালেঞ্জ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মোকাবেলা করা আরো বেশি জটিল ও চাপযুক্ত। প্রশ্ন হলো—এগুলো আমরা কিভাবে মোকাবেলা করব? প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে থ্রেটগুলো আসছে এবং কামড়ে মারবে; তাহলেই আমরা সিরিয়াসলি মোকাবিলা শুরু করতে পারব।

আমি বড়-গুরু একাডেমিশিয়ান নই, তাই সিদ্ধান্তমূলক সমাধানগুলো হয়তো থিওরেটিক্যালভাবে গোছানোভাবে বলতে পারব না। তবু সংক্ষেপে বলছি—বাংলাদেশী গার্মেন্টস খাতকে সবদিক থেকেই তৈরি হতে হবে; বিশ্বের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হতে হবে। আমাদের অপটিমাম ব্যবহার করতে হবে বিদ্যমান রিসোর্স; এনার্জি, অর্থ, সময় এবং অপর্চুনিটি ওয়েস্টেজ কমাতে হবে। মানবসম্পদ ঘাটতি পুরন করতে হবে—উভয় দিকেই: লেবার ও ম্যানেজমেন্ট। গার্মেন্টস সেক্টর লেবার-ইনটেনসিভ; খাতের উন্নতির মূলটি ম্যানপাওয়ারের সক্ষমতা বাড়াতেই।

একটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে অনেক কিছু করতে পারবে—প্রথম ধাপে বিপদের আগেই সেটা রিয়েলাইজ করা, বিপদের ধরন ও কারণ বোঝা, ইন্টেলেকচুয়াল ও টেকনিক্যাল ম্যানপাওয়ারকে সিঙ্ক্রোনাইজ করা, প্রো-অ্যাকটিভ ব্যবস্থা নেয়া, ওয়েস্টেজ স্টপ করা এবং নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করা—এইগুলো জরুরি। আমি বলব—অত্যন্ত স্মার্ট, হাই-কোয়ালিফায়েড এবং প্রফেশনাল কর্মী হায়ার করুন; এ্যামেচার দিয়ে গার্মেন্টস আর চলবে না। সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট—এই নীতি মেনে চলতে হবে।

আর এক ব্যক্তিগত বিশ্বাস (যা হয়তো অবৈজ্ঞানিক শোনাবে): বাংলাদেশের গার্মেন্টসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো—এক; গার্মেন্টস সেক্টর ও এর যোদ্ধাদের লড়াকু স্বকীয়তা ও অতীত সাফল্য; দুই; বাঙালী কখনও কারো কাছে নত হয়নি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মন্ত্র।

#RMGsector #Garment #ChallengesInRMG #ManpowerQuality #HumanasResource #HumanQuality

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *