এখানে একজন ’একদা মানুষ’ শুয়ে আছে। তার মানব হৃদয়টি বহু ব্যবহারে ক্লান্ত হয়ে লোহিত রক্তকে আর শিরায় শিরায় প্রবাহিত করতে পারছে না।
ফুসফুসটি হতোদ্যম হয়ে আগেই ছুটি নিয়ে নিয়েছে। চোখ দুটি এই কদর্য জগতের পার্থিব বা অপার্থিব অশ্লীল অভিনয় আর দর্শন করতে চাচ্ছে না। এখানে একজন ’একদা মানুষ’ মারা যাচ্ছে।
মানুষটির মা তাকে আজ হতে ৩৬টি বসন্ত আগে নয় মাসের গর্ভ হতে এই ধরার মুখ দর্শন করিয়েছিলেন। আর দশটি মনুষ্য শিশুর মতো তার ধরাগমনেও কতগুলো মনুষ্য প্রজাতির প্রাণী কলকল করে হেসে উঠেছিল। মনুষ্য শিশুটির পিতা পৌরুষের আভিজাত্যে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিল। মোল্লা সাহেব উচ্চকিত স্বরে খোদার শুকরিয়াতান আজান তার কর্ণকুহরে দিয়েছিল।
বাড়ির বুড়ো বিগত যৌবনা টিকটিকি দম্পতিও সেদিন টিক টিক করে তাদের খুশির জানান দিয়েছিল। বয়স্ক মুরগীটি তার সর্বশক্তি দিয়ে একটি ডিমও পেড়েছিল মনিবের পৌরুষের প্রমান পেয়ে।
কিন্তু মানুষটি আজ চলে যাচ্ছে, নিরবে, সবার আগোচরে। কেউ তার পাশে বসে নেই মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে যদিও কিছুকাল আগেও একজন ছিল যে অষ্টপ্রহর তাকে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে ভরিয়ে রাখত।
আজ আর কেউ নেই। শোকাহত মানুষের মিছিল তার বিদায়যাত্রায় শামিল হয়নি। মোল্লা সাহেব তাকে খোদার নাফারমানির নরক হতে মুক্তি দিতে, তাকে অন্তিম গোনাহমাফির মন্ত্র পড়াতে আসেননি। পাড়ার ছেলেছোকরা, যারা কারনে অকারনে হাত পাতত চাঁদার জন্য তারাও আজ ব্যস্ত অন্য কোনো উৎসবের আয়োজনে।
বাড়ির দারোয়ানটি যে সর্বদা রাতবিরাতে গেটের হুড়কো খুলে দিত বিরক্ত মুখে, সে ব্যস্ত আছে প্যাঁচপেঁচে কাদায় নষ্ট হওয়া মার্বেলের সিড়ির সৌন্দর্যহানি নিয়ে।
মানুষটি কোনো শুভার্থী রেখে যাচ্ছে না। তার কোনো উত্তরাধিকারও নেই। তার মউতের অনুষ্ঠান কোনো বানিজ্যিক চ্যানেল লাইভ দেখাবে না। দেশের প্রধান, বিরোধীদল প্রধান, সুশীল সমাজ তার অন্তর্ধানে কোনো নির্বিকার শোকবাণী দেবেনা। পত্রিকার কোনো কলাম তার জন্য অপচয় হবেনা।
সে নিরবে চলে যাচ্ছে। কোনো বিদায় অনুষ্ঠান ছাড়াই। তার মৃত্যুকালে কেউ শোকের অশ্রু ঝরাবার না থাকলেও টলটলে জল নিয়ে বর্ষন অপেক্ষমান একটা আকাশ আছে।
সে শুয়ে আছে পথের কাঁদায়, একটি ভেজা চুপসানো বেড়াল তার পাশে লেজ গুটিয়ে বসে তাকে দেখছিল। হঠাৎ আকাশ তার সর্বশক্তি দিয়ে মানুষটির জন্য শোকের অশ্রু বর্ষণ করতে লাগল। বৃষ্টিতে ধুয়ে যেতে লাগল তার এই জীবনের সব কালিমা, মনের সব জমানো কষ্ট। শরীরের তাপ, শোক, যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে যাচ্ছে সেই শীতল বর্ষাধারায়। তার হৃদয় নির্জীব হয়ে আসছে, ফুসফুস ধুঁকতে ধুঁকতে ক্লান্ত, তার শ্বাস নিভূ নিভূ করছে। বেড়ালটি ঠিক বুঝছে না তার কি করণীয়। মানুষটি নিরবে চলে যাচ্ছে। সবার অগোচরে।
মৃত্যু, তুমি নিশ্চই আসবে তোমার সময়মতো। আমি তোমার জন্য প্রস্তুত, শুধু এখনো কিছু বিদায় নেবার বাকি। সেটুকু ফুরসত কি তুমি দেবে না আমায়? শুধু অল্প কিছুটা সময় ভিক্ষা দাও। কিছুটাই, তার বেশি নয়।
#death #life #DeathParade