Skip to content

মুক্তির ছোট গল্প

  • by

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সোনালী জানত না মুক্তিযুদ্ধ কী।

ঠিক যেমন আজও সে জানে না, বীরাঙ্গনা কী। তাকে নিয়ে ইউনিয়ন বোর্ডের স্যারেরাও তালিকা করার সময় দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। তাকে ঠিক কোন ক্যাটাগরিতে তালিকাভূক্ত করা হবে-মুক্তিযোদ্ধা? বীরাঙ্গনা? নাকি রাজাকার? কনফিউশনটা একটু খুলেই বলি আপনাদের।

৭১ সালে সোনালীর বয়স তখন সতের কি আঠারো হবে। পশুর নদীর পাড়ে বাণীশান্তার পল্লীতে ততদিন সোনালির লজ্জামোচন হয়ে গেছে। ঠিক যেমন করে ঘুঁচে গেছে তার বাপ-মার দেয়া নাম। তা সে সোনালী আজ নিজেও তার আসল নাম মনে করতে পারে না।

দেশে যে মুক্তির যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে-সেটা তার জানা ছিল না। মুক্তির আশা সে বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছে। ফিরবার স্বপ্ন তো দেখতই না। সারাদিনের কাষ্টমারের দাবী সামলে দেশ নিয়ে ভাববার ফুরসত কোথায় ছিল তাদের?

কিন্তু যেদিন নদীতে সারি সারি মরা লাশ ভেসে আসল, সেদিনই সে আর তার সঙ্গীনি আরও অনেক মেয়ে প্রথম জানতে পারল, দেশে বড় রকম কিছু একটা হয়েছে। লোকে বলাবলি করছিল, ঢাকায় গন্ডগোল হয়েছে। আর তার কিছুদিন পরে তাদের পল্লীতেও ছড়িয়ে গেল দুটো সংবাদ,

“দ্যাশে আর্মি নামছে।”

আর “মুক্তিযোদ্ধারা আইতাছে।”

বাণীশান্তার ঝুপড়ি হতে যেদিন তাকে চেয়ারম্যান সাব ক্যাম্পে চালান দেয়, সেই দিন সে ভয় পেয়েছিল, নাকি খুশি হয়েছিল-তা তার মুখ দেখে কেউ বোঝেনি। কেউ খুব একটা ভাবেওনি সেটা নিয়ে। তার আর আপত্তির কী আছে? বেশ্যাকে পাক ক্যাম্পে চালান করে যদি গ্রামের সবার জান বাঁচে, তাতে ক্ষতি কী? সেই রাত ও আরও অনেক রাত ক্যাম্পেই কাটে সোনালীর। তারপর………….

না।

সোনালী মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। নিজের মুক্তি বা দেশের মুক্তি নিয়ে ভাববার মতো মানুষ তো সে নয়। সে শুধু মে মাসের কোনো এক গরমের রাতে হারিয়ে যায়। গন্ডগোলের মধ্যে কেউ তাকে পালাতে বাঁধা দিতে পারেনি। কেউ হয়তো চায়ওনি।

এর দুই মাস পরে তার দেখা মেলে করুণাবতি গ্রামে। পুড়িয়ে দেয়া বাজারটার এক ধারে নদীর একদম পাড় লাগোয়া তার ঝুপড়ি। কে সে? কী তার পরিচয়, কীভাবে চলে তার দিন-কেউ আর সেই খোঁজ নেবার মতো অবস্থায় ছিল না তখন।

খালি জানত, সন্ধ্যা নামলেই তার ওখানে পাকিস্তানী ক্যাম্পের জোয়ানদের আনাগোনা হত। মাঝে মধ্যে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সাবও যেতেন সেখানে। কেন এই আনাগোনা-সেটা অবশিষ্ট গ্রামবাসীর কাছে পরিষ্কার হলেও তা নিয়ে তখন মাথা ঘামানোর চেয়ে জান বাঁচানোই ছিল বড়। খালি নিজেদের মধ্যে কখনো আলাপ উঠলে, সবাই ফিসফিস করে বলত, “বেশ্যা বেডি”।

জুন হতে ডিসেম্বর-সোনালী গুনে গুনে ১৯ জন পাক সেনা আর শান্তি কমিটির চ্যালাকে তুলেছিল তার ডেরায়।

রাতটা তারা সোনালীর ওখানেই কাটাতো। শুধু পরের দিন সকালে প্রমত্তা পশুর নদীর ঘোলা পানিতে একটা লাশ ঝুপ করে পড়েই ভেসে যেত কোথায়। আর সোনালী তার ঘরের দাওয়ায় লালপেড়ে সাদা শাড়িতে এলানো ভেজা চুলে বসে তাকিয়ে থাকত দূর পূবের আকাশে। রক্তের মতো সদ্য উদিত টকটকে সূর্যকে সে দেখত, নাকি অন্য কিছু তা কেউ জানতো না। জানতে চাইতও না।

শুধু হঠাৎ হঠাৎ কারো নজরে পড়লে অস্ফূটে বলে উঠত, “বেশ্যা বেডি”।

সোনালী নিজেও এখনো জানে না, সে কী? বেশ্যা? মুক্তিযোদ্ধা? রাজাকার? নাকি বীরাঙ্গনা?

[*গল্প লেখা আমার কম্ম না। এটা গপ্পও না। এই লেখার ভিতরে সাহিত্য বা যুক্তি খুঁজলে আপনি অযথাই হয়রান হবেন। এটাকে একটা সাময়িক ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ বলতে পারেন।

#story #liberationwar #warofindependence #1971 #warheroes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *