Skip to content

ঢাকার সড়ক ও নাগরিক অভিযোজন নিয়ে এক গুচ্ছ

  • by

এক: মসৃন অভিযোজন;

অভিযোজন জিনিসটা পুরোপুরিভাবে সহজে বুঝতে চাইলে পশ্চাৎদেশের মতো দ্বিভাজিত ঢাকা নগরের রাস্তায় আসুন। জ্যামে পড়ে হালকা ঘুম ধরে গিয়েছিল। হঠাৎ-“আসুন, আমাদের গাড়ির কাছে, দেখুন আমাদের মলমটা…………..”এমন মধুর ডাক শুনে ঘাঁড় ঘোরাই। আমার বাহনের তিন গাড়ি পেছনের একটা ঠেলা ভ্যানের ব্যাটারী চালিত ছোট্ট মাইকের মুখ হতে বাতাসে ভেসে ভেসে আসছে। পণ্যের নাম সান্ডার তেল, রিয়াদ বাম। অসুখের নাম দাউদ, খুজলি, খোঁসপাঁচড়া, খাউজানি। ব্যস্ত অফিস আওয়ারে গাড়ির ভীড়ের মধ্যে জলন্ত অমৃত বিক্রী হয় ঢাকা নগরে। ঢাকার রাস্তায় আপনাকে স্বাগত। অভিযোজনের প্রাকৃতিক ক্লাসরুমে। মানুষ, পাঁচমিশালি গাড়ি, পশুরা কী যে চমৎকারভাবে এখানকার রাস্তায় অভিযোজিত প্রাণীদের মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে একসাথে চলছে-সে এক পরম বিষ্ময়। পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীবিজ্ঞানী, নৃ-বিজ্ঞানী, আরবান প্ল্যানার এই ঢাকার রাস্তায় আসলে তব্দা মেরে বসে থাকবেন। ঢাকার বায়ুমান স্বাভাবিকের সাতগুন খারাপ, তারই ভেতরে দোপেয়ে মানুষ কীভাবে শ্বাস নিচ্ছে, নেবার মতো অভিযোজিত হয়েছে-সেটাই বায়োলজির গবেষণার বিষয় হতে পারত। ওদিকে, পদচারীরা চলমান গাড়িগুলোর সাথে সমানে ঘঁষে, লেপ্টে, মুচড়ে, এঁকেবেঁকে টুকি খেলার মতো চলেছে। যেন ওগুলো চলমান গাড়ি না, ঘরের বউ। ড্রাইভিং সীটে বসা ব্যক্তির ঘাম ছুটে যাচ্ছে তার গাড়ির তলে কেউ না পড়ে-তা নিশ্চিত করতে গিয়ে। দুজন মহিলা চিপা দিয়ে গ্লাইড করার সময়ে পেছনের ব্যাগে লেগে গাড়ির সাইড উইন্ডোটার  ঘাড় উল্টে গেল।   আমি আমাদের চালকের ঠোটের ওঠানামা হতে যেই গালিটা আবিষ্কার করলাম তার প্রথম শব্দ *চু। বাকিটা পড়তে পেলাম না। চলমান গাড়ির ফাঁক দিয়ে অফিসগামী মানুষ সাপের মতো এঁঁকেবেঁকে সড়ক পার হচ্ছে, সাইকেল ১ নম্বর লেনে গাড়ির চিপা দিয়ে ঠেলে, গুঁতিয়ে, কখনো মাথায় নিয়ে সামনে বাড়ছে। পথকুকুরগুলো মানুষের গা ঘেঁষেই এই নগর সড়কে চলেছে। তাদেরই একটা রাস্তার ওপাড়ে একটা মাদীকে দেখে ছুট লাগাল। যেতে যেতে পা তুলে একটা লেক্সাস গাড়ির টায়ারে জলত্যাগ করেই দৌড় দিল। লেক্সাসের ড্রাইভারের মুখের চেহারা দেখা গেল না। কালো গ্লাস তোলা। রিক্সা ১ নং লেনে ঢুকে চলছে, যার এই রাস্তায় ঢোকা নিষেধ। পেছনে অ্যাম্বুলেন্স পোঁ পোঁ করছে। রিক্সা বাবাজি প্রাণপণ চেষ্টা করেও তার জন্য রাস্তা দিতে ব্যর্থ। বাস চলছে তিন নম্বরে গিয়ে, যার থাকার কথা ১ নম্বরে। উল্টো দিক হতে ফুঁচকার ভ্যান ঢুকে পড়েছে একটা। তাকে নিয়ে মহা ক্যাঁচাল। একটা প্রণয়াবদ্ধ জুটির প্রেমিক তার বুরকা পরা প্রেমিকার কোমর জড়িয়ে ধরে পার হচ্ছিল। মাঝপথে প্রেমের আবেশের ঠেলায়, থেমে থাকা পাজেরোর বুলগার্ডের ওপরই হেলান দিয়ে প্রণয়ীকে কী যেন বোঝাচ্ছে। পাজেরোর ড্রাইভার বিকট শব্দে হর্ণ দিতেই প্রেমিক প্রবর তার প্রেমিকার সামনেই কুৎসিত একটা গাল দিয়ে প্রেমিকার হাত ধরে টান দিয়ে চলতে লাগল। প্রেমিকের কুৎসিত গাল শুনেও প্রেমিকা হেসে গড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হল। সামনে সিগন্যাল পড়ল।  তিনজন হকার সাথে সাথে গাড়ির সারির মধ্যেই আমড়া, তোয়ালে, মাস্ক’র সওদা নিয়ে নেমে পড়ল। পাশের গাড়িটার জানালায় একজন বৃহন্নলা চাঁদা চাইতে নক-নক। পেছনে বসা পুরুষ যাত্রী পয়সাও দিচ্ছে না, যেতেও বলছে না। থেমে থাকা গাড়িতে বসে সে বৃহন্নলার শরীরটাকে গিলে খাচ্ছে।  সামনের ময়লার গাড়ি হতে ময়লা উপচে পেছনের BMW সেডানটার বনেটে এক তাল ময়লায় মাখামাখি হয়ে গেল।সেডানের ড্রাইভার দরোজা খুলে রেখেই ময়লার মালিককে *দিরভাই গালি দিতে দিতে নেমে গাড়ি পরিষ্কার করতে লেগে পড়ল। ওদিকে তার পেছনের ষন্ডা বাইকার *দিরভাই গালি দিয়ে ওভারটেকের রাস্তা চাইল। বাইকারদের নীতিই হল, রাস্তায় এক সেকেন্ডের জন্যও ব্রেক করা যাবে না। সেডানটার সামনেই তিন হাত জায়গা খালি। সেটা অকুপাই করার ইচ্ছা তার। জ্যামে পড়ে সামনের পিকআপটার ড্রাইভার আশা ছেড়ে দিয়ে একটা বিড়ি ধরায়। সিগন্যালের মাথার ট্রাফিকের কনস্টেবল হাতটা বাড়ায়-বিড়িটা চায়। পিকআপ ড্রাইভার মনে মনে, মুখভঙ্গিতে *দিরভাই গাল পেড়ে বিড়িটা বাড়িয়ে দেয়।  মাথার ওপরে লোহার কমলা-সবুজ রাঙানো ওভারব্রীজ। এক মহিলা বাচ্চাসহ যাচ্ছিল। হঠাৎই থেমে বাচ্চাকে হিশু করানোর জন্য ওভারব্রীজের কোণায় এনে দাড় করিয়ে একটানে ইলাস্টিক দেয়া হাফপ্যান্টটা হাঁটুর নিচে নামিয়ে দেয়। অপুষ্ট চেহারার বাচ্চাটা ওভারব্রীজের রেলিংয়ে ঘেঁষে দাড়িয়ে নিচের পানে হিশু করা শুরু করল। যেন এটা একটা খেলা। ওদিকে নিচে রিক্সায় বসা দুই স্কুল পালানো টিনএজার প্রেমিক-প্রেমিকা। ওপর হতে বালকের বিসর্জিত হলুদ মুত্র নিচের টিনএজ প্রেমিকের সাদা স্কুল ড্রেসে পড়ল। প্রথমে না বুঝলেও সাদা জামায় হলুদ বর্ণ দেখে ওপরে তাকিয়ে অসময়ের বৃষ্টির প্রকৃত উৎস দেখে প্রেমিকা হেসেই খুন। প্রেমিক প্রবর ওপরের বাচ্চাটার উদ্দেশ্যে যে গালিটা দিল, সেটা এই নগরের রাস্তার ভয়ানক ১৫০ ডেসিবলের শব্দ ভেদ করে তার কানে গেল কি গেল না জানি না। তবে তার মুত্রত্যাগ শেষ হল। ফুটপাতের পাশেই মায়ের দোয়া ভাতের ’হোটেল’। সেখানে তাওয়ায় কড়া করে পরোটা ভাজা হচ্ছে। তাওয়ার সামান্য দূরেই খোলা ড্রেন। ড্রেনের কিনারায় সিটি কর্পোরেশনের ধাঙররা কোদাল দিয়ে তরল ময়লা তুলে রাখছে। তাতে পরোটার কারিগরের ভাবান্তর নেই। সেই পরোটার তেলের পাশেই একটা ওমলেট ছেড়ে দেয়। ওমলেটটা সুন্দর করে ফুলে উঠল। এত দূর হতেও তার ঘ্রান কিছুটা মনে হল পেলাম। নাকি, হয়তো কল্পনা। ভাতের হোটেলের ওপরে মুনলাইট ’ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেল। সাইনবোর্ডে “সম্পূর্ণ *সামাজিক কর্মকান্ড মুক্ত”-এতটুকু পড়তে পারলাম। সম্ভবত ‘অ’টা মুখে গেছে।  অসামাজিক কর্মকান্ড মুক্ত হোটেলের সামনেই একটা পাগল তার জটাধারি মাথা আর নিম্নাঙ্গ নিয়ে দিগম্বর হয়ে ফুটপাতে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তার এক হাতের পুরোনো একটা পত্রিকার লাল কালির হেডলাইন এতদূর হতেও আমার নজর এড়ায় না, “বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ”।  পাগলের আরেক হাতে আধখাওয়া একটা পরোটা। সামাজিকতার একটা চমৎকার পাঠ পেয়ে গেলাম। ট্রাফিকের বিড়ি খাওয়া শেষ হল কিনা জানি না, গাড়ি আবার হালকা চলতে শুরু করে। আমি তবু ঢাকার রাস্তার অভিযোজন নিয়েই ভাবতে থাকি। এ এক দারুন সহাবস্থান। দারুন ইকোলজি। অসামান্য অভিযোজন।

দুই: নাগরিক ব্যস্ততায় বাস্তবতার জট;

নানা কারনেই অফিস হতে বের হতে দেরী হয়। কি রমাদ্বন, কি সাধারন মাস। বহু বহুদিন পরে ঢাকা শহরে অফিস করার মজা হাড়ে হাড়ে টের পাই। জট (জ্যাম) নামক উন্মাদ আমাকে তার স্থায়ী মুরীদ বানিয়ে নিয়েছে। তেজগাঁও উড়ালসেতু কিংবা মহাখালিতে অথবা ৬০ ফুট। আটকে থাকি বেকুবের মতো। তবে কাজের কাজ একটা হয়। অনবরত কীপ্যাডে আঙুল চালাই। বিগত ৩ মাসে মোটামুটি ৯০ পৃষ্ঠা লেখ্য বস্তু (কনটেন্ট) যানজটে বসেই লিখে ফেলেছি। জানালার কাঁচের ওপাড়ে ঘর ফেরত মানুষের তীব্র ব্যস্ততা। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি ঘরে ফেরার জন্য মানুষের উদগ্র ব্যস্ততা। উদভ্রান্তের মতো মানুষ ছুটে যাচ্ছে ঘরের পানে। আইন মানার কোনো বালাই নেই। রিক্সাওলা নতুন গাড়িওলার গাড়িতে দিচ্ছে ধাক্কা। গাড়িওলা বাইকওলাকে প্রায় দিচ্ছে চাপা। ঘষা লেগে কারো নতুন গাড়ির দশা শেষ। অনশনমুক্তি (ইফতার) বাসায় গিয়ে পরিবারের সাথে ধরার ব্যগ্রতায়। আহা! ইফতার উপলক্ষ্য করে তাও মানুষগুলো ছুটছে। অন্তত একটা মাস পরিবারের সাথে একটু আগে মিলিত হবার এই মৌসুমী তাড়নায় এই আইনভঙ্গ দেখেও তৃপ্তি লাগে। ধর্মের আসল থীমতো এটাই। মানব জীবনকে কোমল একটি জীবন দেয়া, প্যাশনেট জীবন দেয়া। কীপ্যাডে ঘ্যাস ঘ্যাস করে লিখে চলি। লেখাটা মনে হয় নেশায় পরিণত হয়ে গেছে। একটা সময় সচেতনভাবে মোবাইলটা বা ল্যাপটপটা বন্ধ করে দূরে রাখি। ভাবি আর ছুঁব না। ওমা! ঘন্টাখানেক পরে দেখি, আমি আবার লিখছি গত একঘন্টা ধরে। যানজট যেখানে ছিল সেখানেই। আমি সেই একঘন্টা আগের যায়গাতেই বসে আছি। ইফতারের আর বাকি ১৫ মিনিট। আমি হয়তো বিজয় স্মরনি। কীপ্যাড হতে বাইরে চোখ দিই।  না, আমাকে বাইরের চলমান ব্যস্ততা টানে না। ব্যকিব্যস্ত করে না। বকের মতো নির্লিপ্ততা আমার। একা আমারই কোনো ব্যস্ততা নেই। ঘরে ফেরার তাড়া নেই। ইফতার ধরার তাড়া নেই।কোনোকালেই ছিল না। যতটা আছে আরো একটা নতুন লেখা দ্রূত শেষ করার জন্য। অনশনভঙ্গ (ইফতার) মানে ছোলা, পিঁয়াজু, বুট, ঘুগনি, শরবত, কাবাব তো নয়। এক ঢোঁক পানি মানেই ইফতার। যেটা আমার নবীজি সা. এর ৯৯% ইফতার ছিল। আমি রাস্তার দু’পাশের অস্থায়ী ইফতার দোকানে ঘরফেরত মানুষের তীব্র হলাহল দেখে ৫৭০ বছর আগের মদীনার ছবি চোখে ভাসাই। নেট ঘেটে নবীজীর যুগে ছোলা পিঁয়াজু বেগুনী তাদের ইফতার তালিকায় ছিল কিনা, জানার চেষ্টা করি। এই লেখাটাও পথে লিখে ফেলা। লাইভ। এতক্ষণে চোখে পড়ল আকাশের পানে। দুর্দান্ত একটা মেঘ ঘনিয়েছে। কামনা করি, রাতে আকাশের কান্নায় নিজের কান্না ঢেকে যাবে। নীল অম্বরের কাজল অশ্রু বর্ষার জলে ভেসে যাবে এই ভূমিপুত্রের অসময়ের কান্না। এসো বৃষ্টি, এসো। নীপবনে। তোমার অপেক্ষায় নগরের কোটি দেড়েক মানুষ। আর আমি। [বৃষ্টি ওইদিন শেষতক এসেছিল। বিলম্বিত বর্ষনে। রাত গভীরে।] আমরা বাঙালিদের নিয়ে একটি কুকথা চালু আছে। তা হল, ”না ঠেকলে আমরা খুরা ভিজাই না”। মানে হল, বিপদে না পড়া পর্যন্ত আমরা সতর্ক হই না। একটি খটকা আপনাদের বলি। দেখুনতো, এই বিপদটার কথা কখনো ভেবেছেন কিনা?আপনার বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যায় ছোট ছোট পায়ে টানা ভ্যান। ওই ভ্যানগুলোর মাত্র একটি দরোজা, তাও থাকে লক করা। তার ওপর তিন চাকার ওপরে খুবই ভারসাম্যহীন একটি যানে ওই ভ্যান বানানো হয়। ভাবুনতো, ওই ভ্যানটি আপনার শিশুর জন্য কতটা নিরাপদ? আসামীদের পরিবহন করার জন্য প্রিজন কার নামে যেই জিনিসটি আছে, সেটি আসলে একটি কনভার্টেড বাস। দুর হতে প্রিজন ভ্যান যতটা দেখেছি, তাতে এটি একটি ছোটখাটো লোহার খাঁচা ছাড়া কিছুই নয়। এই ভ্যানটি ভর্তি থাকা অবস্থায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বন্দী ও সাথে থাকা প্রহরীদের উদ্ধার করতে করতেই মানুষ মরে শেষ হয়ে যাবার কথা। সহজে উদ্ধার করার কোনো পন্থা দেখি না। তাছাড়া কোনো দিক দিয়ে কোনো ইমার্জেন্সি দরোজা থাকে বলে আমার জানা নেই। টাকা বহনের সময় নিরাপত্তা দিতে ভাড়াটে কোম্পানী আজকাল তাদের টাকাবাহক গাড়ি ও প্রহরী ভাড়া  দেন। কখনো ভেবে দেখেছেন, টাকা ও মূল্যবান জিনিস বাহক ওই গাড়িগুলো আসলে খুব হেলাফেলায় কনভার্ট করা মাইক্রোবাস বা মিনিবাস? ওই গাড়িগুলো কোনো বড় দুর্ঘটনায় পড়লে, খাদে পড়লে ভিতরের লোকগুলো স্রেফ গরমে ভর্তা, ইদুর আটকা কিংবা পানিতে চুবিয়ে মরবে। কারন কোনো ইমার্জেন্সি ডোর নেই। গ্লাস নেই, যে আপনি ভেঙে বের করবন।এরকম আরো আরো উদাহরন দেয়া যাবে। গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনে মৃত্যু তো এখন নিয়মিত ঘটনা। লক্ষ লক্ষ গাড়ি তার পেছনে একটা গ্যাস বম্ব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একদম জীবন্ত গ্রেনেড। বাংলাদেশে জিনিসপত্রের মানের যেই ভয়াবহ অবস্থা, সিলিন্ডারগুলো যে মানহীন কিংবা একদা মানসম্পন্ন হলেও মেয়াদোত্তীর্ন হয়ে ভিষন ঝুঁকিপূর্ন, তা না বললেও হয়। ভাবুন তো, দেশের বড় বড় শহরে লক্ষ লক্ষ গ্যাস বম্ব জীবন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার একটা যদি কোনো বাজারে বা স্কুলে বিস্ফোরিত হয়? কে আছে এসব নিয়ে ভাববার? জাতি তো বৃটেনের বৃষ্টি নিয়েই ব্যস্ত। ওদিকে আপনার ছোট মেয়েটা যে তিন চাকার ভ্যানে সকালে স্কুলে গেছে, তার যে নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত, তা নিয়ে দুদন্ড ভেবেছেন?

তিন: হর্ণী ঢাকার হর্ণী রাস্তা;

সৃষ্টিকর্তা গরুকে মাথার ওপর দুটো হর্ন (শিঙ) দিয়েছেন গুঁতিয়ে আত্মরক্ষার জন্য। গন্ডারকে নাকের ডগায় দিয়েছেন ঢুঁ মারার জন্য। এই নির্বোধ পশুরা তবু খুব সামান্যই সেই হর্ন ব্যবহার করে। যে জন্য গোয়াল ঘরে বা জঙ্গলে কোনো NO HORN সাইন চোখে পড়ে না। আবিষ্কর্তা গাড়িকে একটা হর্ন দিয়েছেন। সৃষ্টির সেরা বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ সেই হর্ন কোনো দরকার না হলেও নির্বিচারে ভূভূজেলার মতো টিপাটিপি করে।  হর্ন বাজিয়ে চালকরা পৈশাচিক আনন্দ পায়। সিগন্যাল ছাড়তে দেরি হচ্ছে? দে হর্ন।  সামনের গাড়ি আস্তে এগোচ্ছ? দে হর্ন। সিগন্যাল ওপেন কম করেছে? দে হর্ন। সাইড চাই? দে হর্ন। সাইড দেব না? দে হর্ন। সাইড দিলাম, যা ব্যাটা। দে হর্ন।  অনেকক্ষন হর্ন দেবার পর সাইড দিছিস? দে হর্ন।  সামনের গাড়ি রিয়ার গিয়ারে সামান্য গেছে? দে হর্ন। ইন্টারসেকশন পার হবেন? দে দে দে হর্ন। সিগন্যাল পড়েছে? সামনে দুই গাড়ির চিপায় একটু ঢুকে পড়তে হবে? হন হন হর্ন।  জ্যাম ছাড়ে না? দিতে থাক হর্ন।   রিক্সা ডান লেনে ঢুকে পড়লে, তাকে ঠুয়াতে দে হর্ন।  রাস্তা ফাঁকা, টপ স্পিড, কিন্তু উচক্কা যাতে আইল্যান্ড হতে লাফ দিয়ে রাস্তায় গাড়ির তলে না পড়ে, তাই গাড়ি Horny.  সর্বোপরি,চালকের হ্যাডাম দেখাতে হবে? লাগা হর্ন।  গোটা চালক সমাজ এত HORNY কেন?

চার: যানজটে জান ভজঘট;

সামনে পিছনে ধাবমান গাড়ির মধ্যে জ্যামে বসে আছি। মেঘ মেঘ অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। জটে বসে গাড়ির জেল্লা মাপি। কোন গাড়িটার কত দাম হতে পারে, কোনটা বেশি দামি। দিশা পাইনা। তবে একটা মজার জিনিস কী জানেন? ঢাকার রাস্তায় কিন্তু এখন ব্যসিক গাড়ি সেডান না। মধ্যম আয় গাড়ির স্টাটাসেও হিট করেছে। মাঝারি গোছের SUV প্রচুর নজরে পড়ছে। গাড়ির আধো ঘোলা গ্লাসের ওপাড়ে তীব্র ঠান্ডাতেও ফর্সা রমনীরা টিস্যুতে ঘাম মোছেন। দামি গাড়ির ড্রাইভারদের আলাদা কেতা। পাশে দাড়ানো সেডানকে সে তাচ্ছিল্য’র নজরে একবার তাকিয়েই পরক্ষণে লুকিং গ্লাসে চুলের ভাজ দেখে নেয়। তেজগাঁও বস্তির মাথার ওপর দিয়ে যখন ফ্লাইওভারে দাড়িয়ে পড়ি, নিচের বস্তির একটা উদোম ছাদের টয়লেটে জনৈক বদনসিবের কর্মকান্ড নজরে পড়ে। নাহ! ধনী গরিব যেমনই হোক, টাট্টি খানায় সবাইকেই উদোম হয়ে বসতে হয়। গাড়ির জানালায় মৃদু টোকা পড়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই। একজন বৃহন্নলা। দুর্বোধ্য ভাষায় ভিক্ষা দাবি করে। ঠোটে কড়া সস্তা লিপস্টিক। দুহাতের চমৎকারিত্বে কী করে যেন অদ্ভূত রকম করে হাত তালি দেয়। ভিক্ষার ফাঁকে গাড়ির লুকিং গ্লাসে তার কাজলটা চেক করে। মিছিমিছি ওড়না টানাটানি করে। শেষ মরিয়া চেষ্টা।  যান্ত্রীক নগরে যান্ত্রীক শকটের যাত্রীদের নজর কাড়ার। না পেয়ে ভেঙচি কেটে চলে যায়। পাশের ফুটপাতে ১০ বছর আগের মুমূর্ষু রোগীটাকে পলিথিনে শুইয়ে তার কল্পিত মা আজও চিকিসসার টাকা তোলে। হাতে একটা নোঙরা লেমিনেট কাগজে রোগীর আক্রান্ত যৌনাঙ্গের ভয়াবহ বিকৃত একটা ছবিসহ প্রেসক্রীপশন। গাড়ির সামনেই বাইকে উঠতি বয়সি এক ছেলে বাইকার। জ্যামে বিরক্ত হয়ে ভীড়ের মধ্যেই মোবাইল হাতে তালুতে কায়দা করে ধরে xxx দেখে। পিছনের বাইকার উঁকি মেরে ব্যপারটা বোঝার চেষ্টা করে। একটা বাইকে নাম্বার প্লেট নেই। পিছনে তার গফ শরীর লেপ্টে থাকে তার বফের। পিছন হতে চুটকি মন্তব্য ছোড়ে একজন। মোড়ের ট্রাফিক নম্বর ছাড়া বাইকারকে সাইজ করবে কিনা ভাবে। সাথে জিনিস আছে। সহজেই ভয় পাবে। আবার ভয় পায়। কোনো ছাত্রনেতা হয় যদি।  রাস্তার ওপাড়েও জ্যাম। একটা সিএনজি দাড়ায়। তার পিছনে কোনো কালে একটা সাবধান বাণী লেখা ছিল  “সাবধান, ধাক্কা লাগাবেন না”।  সেটা কোন বদমাস মাঝেরটুকু কিঞ্চিত মুছে দেয়ায় ভারি দারুন এক দৃশ্য  “সাবধান,……লাগাবেন না।” রোজার খুৎপিপাসাতেও হেসে উঠি।

পাঁচ: এবার একটি সংগ্রহ করা গল্প বলি। ট্রাফিক অ্যালার্ট; মূল লেখক: খুব সম্ভবত জনাব নাজির। 

আসুন, তিতা সত্য কথায় একটু হাসি। গুলিস্তান থেকে উত্তরা যাওয়ার জন্য বাসে উঠলাম! আমার পাশে একজন গর্ভবতী মহিলা বসেছে! পল্টন পৌছানোর আগেই বাসের মধ্যে তার ডেলিভারি হয়ে যায়! তারপর বহুবছর কেটে গ্যাছে, মহিলার মেয়ে যখন ১৮ বছরের যুবতী হলো, তখন আমাদের বাস মাত্র শাহবাগে এসে পৌছেছে! জীবনের ১৮ টা বছর লেগে গ্যাছে পল্টন থেকে শাহবাগ আসতে! আমার বয়স তখন ৩২। বিয়ের বয়স পাড় হয়ে যাচ্ছিলো!  ওই যুবতী মেয়ের মাকে অনেক অনুরোধ করে তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হলো। আমাদের একটা সন্তান হলো! আমার সন্তানের বয়স যখন ১৬ হয়েছে তখন আমাদের বাস বাংলামোটর পৌছে গ্যাছে!  আমার চুল-দাঁড়ি সাদা হয়ে গ্যাছে। আমার শ্বাশুরী মা মারা গ্যাছে আরো দুবছর আগেই! যাইহোক, বাস তো চলতেই আছে। আমরা যখন ফার্মগেট এসে পৌছেছি, তখন আমার ছেলের সাথে পেছনের এক বয়স্ক মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে!  বাসের ড্রাইভার এ পর্যন্ত ৩ জন মারা গ্যাছে বার্ধক্যজনিত কারনে! যাইহোক, মহাখালি ফ্লাইওভারের উপর আমার ছেলের একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে!  বাসে বসেই নাতনীকে গুলিস্তানের গল্প শুনাতে শুনাতে বাস প্রায় এয়ারপোর্ট পৌছে গ্যাছে!  আমার নাতনীর বয়স তখন ১৩ বছর! তারও ৯ বছর পর আমাদের বাস যখন উত্তরা এসে পৌছোলো, তখন আমি আর পৃথিবীতে নেই!  আমাকে বাস থেকে নামানোর জন্য লাশ বহনকারী খাট আনা হয়েছে! আমার জীবনের ৭০ বসন্ত কেটে গ্যালো ট্রাফিক জ্যামে! আমি বুঝলাম, ধূমপান নয়, ট্রাফিক জ্যামই মৃত্যুর কারন!  আহা ঢাকা শহর! আহারে ট্রাফিক জ্যাম!

#trafficjam #roadsindhaka #storyoftheroad #socialadoption #roadaccident #riskyroads #lifethreat #socialnuisance #horn #soundpollution #urbanlife #lifeinmetro #township

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *