টুকলিওয়ালা:
দিন দুয়েক আগে ছুটির দিনের দুপুরে কমোডে বসিয়া হালকা হইবার কালে ফেসবুক স্ক্রল করিতেছিলাম। যাহা দিগের কোষ্ঠ্যকাঠিন্য নামক আজারিয়া ব্যামো রহিয়াছে, তাহারা বিলক্ষণ জানেন, উহারা নিত্য নিত্য কমোডে জীবনের কত কত মধুর ঘন্টা কাটাইয়াছেন। গৃহবধূ দিবানিদ্রা যাইতেছেন, এই মোক্ষম সময়টুকু কাজে লাগাইতে মহান ফেসবুকে ঢুঁ মারার মতো আর কী হইতে পারে?
এই একখানা সময়ই গৃহবধু আসিয়া রসভঙ্গ ঘটাইতে পারেন না। স্ক্রল করিতে করিতে হঠাৎই আমার নিজের একখানা লেখায় চোখ আটকাইয়া গেল। দেখিলাম, লেখাখানার নিচে প্রচুর কমেন্ট, লাইক, ইমো জমা পড়িয়াছে। এত এত পাঠক রেসপন্স দেখিয়া আমার চক্ষু আর্দ্র হইয়া উঠিল। পাছে ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠি, সেই ভয়ে মুখে কিঞ্চিত টিস্যু পেপার আলগোছে গুজিয়া দিতে গিয়াও থামিলাম।
আমার লেখাগুলিতে ৭ খানা মন্তব্য আর ১১ টা লাইক পড়িলেই আনন্দে আমার বাথরুমের বেগ পায়। তায় এই লেখায় কয়েক শত রেসপন্স। আবেগে গদগদ হইয়া আমি এর, ওর, তার-সবার লাইকের প্রতিক্রিয়ায় নিজেও দুইবার লাইক মারিলাম, লাইকারদের ধন্যবাদ জানাইলাম, সমানে দুই হাতের দশ আঙুল ব্যবহার করিয়া সব মন্তব্যের বিপরীতে আবেগীয় প্রতিউত্তর দিলাম। আরও অনেক কিছু করিব ভাবিতেছি। হঠাৎ, লেখাখানার একবারে নিচে চক্ষু আটকাইল। কমেন্টখানা ভাল করিয়া পড়িলাম-”জব্বর লিকচোৎ তো কুদ্দুচ! তরে এমুন লেহা হিয়াইল ক্যাডায়? বুকডা ভইরা গ্যালো হালায়! তরে চুম্মা!”
আমার আবেগের বেলুনখানা সহসা চুপসাইয়া গেল। ভাল করিয়া চক্ষু কচলাইয়া স্ক্রল আপ করিয়া দেখিলাম, আমি নহি, ”জনৈক অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক” থুক্কু জনৈক কুদ্দুচ পালোয়ান উক্ত লেখাখানি লিখিয়াছেন আর তাহাতেই এত এত রেসপন্স। আমি আরো কয়েকবার চক্ষু বুলাইয়া লইয়া লিশ্চিন্ত হইলাম, যে, লেখাখানি আমারই, তবে তাহার মালিক বদল হইয়া কুদ্দুচ হইয়া গিয়াছে। বুঝিলাম, কুদ্দুচ টুকলিওয়ালার হাতে পড়িয়া আমার সাধের লেখাখানি জাতে উঠিয়াছে, যদিও ক্রেডিটের গুড় কুদ্দুইচ্চাই খাইতেছে। অতি আয়াসে আমার সৃষ্ট লেখাখানি তিনি ক্রেডিট না দিয়া নিজের নামেই চালাইয়া দিয়াছেন। আমার ক্রেডিটের শিঁকা ছিড়িবার যোগাড়।
নিতান্ত ক্রোধে কুদ্দুইচ্চার পোস্টের নিচে তৎক্ষণাত মন্তব্য করিলাম, ”প্রিয় কুদ্দুচ সাহেব, আপনার লেখাখানি দারুন লাগিল। এইরকম একখানি রচনা বিগত তিন শতাব্দীতেও কোনো লেখক লিখিতে সক্ষম হন নাই। আপনার লেখাখানি পড়িয়া আবেগে চক্ষুতে এতই জল আসিয়াছে, যাহা এই মুহূর্তে আমার বদনাখানিতে জমা হইয়া শীঘ্রই আবার সুকর্মে নিয়োজিত হইবার অপেক্ষায় রহিয়াছে। লেখাখানির জন্য এই কমোডিয়ানের (কমোড+কমেন্টিয়ান) হৃদয়ের শ্রদ্ধামাল্যখানি গ্রহন করিবেন।” মন্তব্যখানি করিয়া কিয়ৎক্ষণ তব্দা মারিয়া বসিয়া রহিলাম। কমোডকর্ম চুলায় যাক। কমোড আর ইনটেস্টাইন-উভয়েই তব্দা মারিয়া বসিয়া রহিল-আমার মেজাজ কোনদিকে যায়-তাহা নির্নয় করিতে। মনে হইল, জগত থামিয়া রহিল কুদ্দুচের গর্হিত নির্লজ্জতার উচিত জবাব খুঁজিতে।
তবুও মিনিট তিনেক পরেই ’টুপ’ করিয়া একটা শব্দ শুনিতেই প্রথমেই কমোডের তলদেশে দৃষ্টি করিয়া কোনো পরিবর্তন দেখিতে না পাইয়া মুঠোফোনের স্ক্রীনে ঠাহর করিয়া দেখি, কুদ্দুচ সাহেবের কৃত প্রতিউত্তর মোবাইলের স্ক্রীনে ভাসিয়া উঠিল। ‘টুপ’ শব্দের উহাই রহস্য।
কুদ্দুচ লিখিয়াছেন,”ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞ হে কমোডিয়ান। আমার এই বহু যত্নে স্বহস্তে রচিত রচনাখানি আপনাকে আনন্দ দান করিতে পারিয়াছে শুনিয়া হৃষ্টচিত্ত হইলাম। ভবিষ্যতেও আমার লেখা পড়িলে কৃতার্থ হইব। বহু আয়াসে সযত্নে রচিত এই সাহিত্যকর্মটুকু আপনাদিগের মতো পাঠকের ‘ফিডব্যাক’ পাইলে আরও ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিবে।” আমি আর ক্রোধ সম্বরন করিতে না পারিয়া তৎক্ষণাত স্থান, কাল, পাত্র ভুলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলাম, “তবে রে *শালা…………….*বা…………..ৎ”[সেই দিন সেই চিৎকার ও খিস্তির মধ্য দিয়া কুদ্দুইচ্চার গুষ্টি উদ্ধার করিতে গিয়া গৃহবধূর ঘুম ভাঙাইয়া মোবাইল সমেত কমোডে ধরা পরিয়া, পরের কতগুলা দিন নিদারুন নির্যাতন আর মোবাইলবিহীন কাটাইতে হইয়াছে, সেই বর্ননাখানি কোনো আরেকদিন লিখিবার খাহেশ হইতেছে। তবে হইতে পারে, উহাও আবার কোনো নির্লজ্জ টুকলিওয়ালা ইদ্রিচ্চার লোলুপ দৃষ্টির কবলে পড়িয়া যাইবে।]
স্টেরিওটাইপ পলিসি:
প্রাইভেট খাত, বিশেষত তৈরী পোষাক খাতে কর্মরত পিপল ম্যানেজমেন্ট তথা HR/Admin/Compliance/Welfare এ কর্মরত মানুষদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন কিছু জিনিস হল, পলিসী, ফরম্যাট, রিপোর্ট আর পিপিটি।
সারা বছর আমি দেখি, অনলাইনে পলিসী, ফরম্যাট, রিপোর্ট আর পিপিটি খোঁজা ও পাবার আকূতি। আমি নিজেও কখনো কখনো ঠেকায় পড়ে খুঁজি। কোথাও যদি কেউ পোস্ট করেন, “আমার অমূক পলিসী/ফরম্যাটটা দরকার।” অন্তত আরো ১০ জন পাঠক সেই ফরম্যাট নিজের জন্য চাইবেন। একবার এমনকি এও দেখেছি, কেউ একজন কোম্পানী সার্ভিস রূলস শেয়ার করে দেবার জন্য মেইল আইডি চাইলেন। মহত উদ্দেশ্য। কমেন্টে গিয়ে দেখি, প্রায় ৭৫০ জন মানুষ তার মেইল আইডি দিয়েছেন ওই সার্ভিস রূলসের ’ফরম্যাট’ পেতে।
যখনই কোনো সেমিনার বা ট্রেইনিং সেশনে যাবেন, দেখবেন, পুরো সেশনটার মাঝেই প্রচুর মানুষ মোবাইলে বিশেষ কোনো পিপিটি স্লাইডের ফটো তুলে রাখছেন। মূল সেশন চলার সময়ে আসল বক্তব্যে মনোযোগ না দিয়ে কনটেন্ট হস্তগত করার এই প্রবণতার অন্যতম কারনই হল, ওই যে, ফরম্যাট নির্ভরতা। আমার একটা জিনিস খুব জানতে ইচ্ছে করে। প্রফেশনাল জীবনের শুরু হতে আধবুড়ো হওয়া তক বিভিন্ন সভা, সমিতি, সেমিনারে, ট্রেইনিং প্রোগ্রামে গিয়ে মূল কাজে মনোযোগ দেবার বদলে মানুষের ঘাড়ের ওপর দিয়ে, দশজনকে বিরক্ত করে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডের ছবি তোলা আর অনুষ্ঠান শেষে পিপিটির কপি পাবার জন্য যারা হামলে পড়তেন, সেই পিপিটি আর ছবিগুলো নিয়ে তারা অস্কার জিততে না পারুন, অন্তত ঘরে ফিরে জীবনে আর কখনো পিছু ফিরে সেগুলো আরেকবার দেখেছেন কিনা।
যেই দেশে সামান্য হ্যন্ড নোট যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা হয়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে, সেখানে প্রশিক্ষণ একটা ব্যবসায়ীক পণ্য হয়ে ওঠার চান্স কম। কখনো কখনো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, স্কুল, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা নোট বই বা হাতে লেখা নোট চাইলে সেটা যক্ষের ধনের মতো লুকোতেন, নানা অজুহাতে দিতেন না, তারা সেই যক্ষের ধন নোট পড়ে আজকে কে কে আইনস্টাইন, বিল গেটস, জুকারবার্গ, অমর্ত্য সেন কিংবা জবাইদেন হয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়ানক হল, পলিসী কপি করার দিকটা। একেকটা কারখানায় প্রায় শ’খানেক পলিসীর একটি তালিকা থাকে। অডিট চলার সময় যার কপি দেখাতে হয়। কিন্তু মজার বিষয় হল, ওই শ’খানেক পলিসী যতটা না কোম্পানীর পলিসী, তার চেয়েও বেশি হল, ওগুলো সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স বা এইচআর অফিশিয়ালের অডিট ঠেকানো পলিসী। হা হা । মোটেই তা কোম্পানীর ম্যানেজমেন্টের জানা মানা পলিসী না।
আমার মনে পরে, কীভাবে প্রচন্ড সংগ্রাম ও ধৈর্য নিয়ে আমি আমার এক প্রতিষ্ঠানের জন্য পিএমএস পলিসি প্রণয়ন ও অনুমোদন করিয়েছিলাম দীর্ঘ প্রায় ১.৫ বছরের চেষ্টায়। যার জন্য অন্তত ৪ টি হাই প্রোফাইল মিটিংও করতে হয়েছে। ফরম্যাটের কথা নাই বলি।
এক কারখানার টয়লেট ক্লিনিং রোস্টার কপি/পেস্ট হয়ে আরেক কারখানার রোস্টার হয়ে যায়। এক কারখানার রিস্ক এসেসমেন্ট রিপোর্ট ফরম্যাটে কপি হয়ে আরেক কারখানার রিস্ক এসেসমেন্ট হয়ে দাড়ায়। বদনা মেকার কারখানার ’কমপেনসেশন পলিসী’ রাতারাতি হয়ে যায় ৫০ লাইনের গার্মেন্টস কারখানার ’কমপেনসেশন পলিসী’।
না। চিপা গলির কোনো কারখানার কথাই শুধু বলছি না। হালের ক্রেজ গ্রীনরাও আছেন এই দৌড়ে। কবে না যেন শুনি, পলিসী আর ফরম্যাট পাইকারী দরে সরবরাহ করার ব্যবসা দিয়ে বসল কেউ। না।
আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রফেশনালদের একক দোষগুন দিলে অন্যায় হবে। এটা আমাদের ওভারঅল সেক্টরের দুর্ভাগ্য। [ইয়ে, এই লেখা সবার জন্য প্রযোজ্য না। সবাই এক না। আর এই লেখা পড়েই গার্মেন্টসের লোকদের আরেক দফা তুলোধুনো করার দরকার নেই। এই মরক হতে কোনো সেক্টরই খুব এগিয়ে নেই।]
#format #copypastepolicy #limitation #replication #copypaste #duplication #creativity